পাঁচ বছরে আবেদনকারীদের মধ্যে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ৮৫০ জন

আফ্রিকার দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির

আফ্রিকার দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ সেপ্টেম্বর:

বাংলাদেশিদের বিদেশযাত্রার আলোচনা সাধারণত কর্মসংস্থান বা অভিবাসনকে ঘিরেই হয়ে থাকে। কিন্তু আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গত পাঁচ বছরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন নতুন একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা চেয়ে আবেদন করেছেন ৬০ হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশি

তবে আশ্রয় চাওয়া এবং অভিবাসন এক বিষয় নয়। অভিবাসন সাধারণত কাজ, পড়াশোনা, পরিবার, ব্যবসা বা স্থায়ীভাবে বসবাসের মতো বিভিন্ন কারণে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়াকে বোঝায়। আর আশ্রয় আবেদন হলো নির্যাতন, নিপীড়ন, সংঘাত বা নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে অন্য দেশে সুরক্ষা বা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আশ্রয় চাওয়ার প্রক্রিয়া।

তাই আফ্রিকায় আশ্রয়ের আবেদন করা ৬০ হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশিকে সরাসরি অভিবাসী বা অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। তাদের আবেদন করার কারণ ও প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও এক নয়।

আবেদনকারীদের বড় অংশ দক্ষিণ আফ্রিকায়

আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংখ্যা দক্ষিণ আফ্রিকায়।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশটিতে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৫৬১। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৭১৯। ২০২৩ সালে ৯ হাজার ২৩৯, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ৩৯৬ এবং ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৫৪০ জন।

একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০০, ১৫৩, ১৬৯, ১৭৫ ও ১২৩ জন।

পাঁচ বছরের হিসাব দেখায়, আবেদনকারীর সংখ্যা এবং শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া মানুষের সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার পেছনে দেশটিতে দীর্ঘদিনের বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

অন্য দেশগুলোতে আবেদন তুলনামূলক কম

পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের তথ্য রয়েছে। সোমালিয়ায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ছয়জন বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত ছিলেন। নামিবিয়ায় ২০২৩ সালে পাঁচজন বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া যায়।

পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা আরও কম। মালিতে ২০২১ ও ২০২২ সালে ৩২ জন করে মোট ৬৪ জন বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেন। ক্যামেরুনে ২০২৪ সালে আবেদন করেন পাঁচজন।

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে মরক্কোয় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ২০২১ সালে ৭২ জন, ২০২২ সালে ১৬, ২০২৩ সালে ১৪, ২০২৪ সালে ১০ এবং ২০২৫ সালে ১৯ জন আবেদন করেন। পাঁচ বছরে মোট আবেদনকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩১।

মিসরে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর পাঁচজন করে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য রয়েছে। তিউনিসিয়ায় ২০২১ সালে ছয়জন এবং ২০২২ সালে পাঁচজন আবেদন করেন। আলজেরিয়ায় ২০২৫ সালে পাঁচজন বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেন।

৬০ হাজার আবেদন, স্বীকৃতি মাত্র ৮৫০ জনের

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর তুলনায় শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সংখ্যা খুবই কম।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়ে আফ্রিকায় আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা চাওয়া ৬০ হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৮৫০ জন শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন।

অন্যদের বড় অংশের আবেদন তখনো প্রক্রিয়াধীন ছিল অথবা তাদের আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—আশ্রয়ের আবেদন করা মানেই শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া নয়। কোনো ব্যক্তি আশ্রয়ের আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ তার দাবি, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ও আইনি যোগ্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।

অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?

আশ্রয় আবেদন ও অভিবাসন আলাদা হলেও বাস্তবে দুটির মধ্যে কখনো যোগসূত্র তৈরি হতে পারে। কেউ বৈধভাবে কোনো দেশে যাওয়ার পর সেখানে আশ্রয় চাইতে পারেন। আবার কেউ অনিয়মিত পথে কোনো দেশে পৌঁছে সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন। কিন্তু শুধু পরিসংখ্যান দেখে প্রত্যেক আবেদনকারীর যাত্রাপথ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন দেশে ভিসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কেউ আফ্রিকার দেশগুলোকে বিকল্প গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেন। তার মতে, আফ্রিকার কোনো দেশে অবস্থান করে পরে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করার ঘটনাও রয়েছে।

অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, ইউরোপের অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ার কারণে কিছু মানুষ তুলনামূলকভাবে সহজ অভিবাসন ব্যবস্থার দেশ বেছে নিতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের পুরোনো প্রবাসী নেটওয়ার্কও নতুন মানুষকে সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এ ধরনের অভিবাসন প্রবণতা এবং আশ্রয়প্রার্থীর পরিসংখ্যানকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন তাই বাংলাদেশের অভিবাসন পরিস্থিতির একটি অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, এটি সরাসরি ৬০ হাজার বাংলাদেশির বিদেশে অভিবাসনের হিসাব নয়।

বরং এই পরিসংখ্যানের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশিদের আন্তর্জাতিক আশ্রয়প্রার্থিতার ভৌগোলিক পরিধি ইউরোপের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে।

আর সেই বাস্তবতা বোঝার জন্য অভিবাসন নয়, প্রথমে দেখতে হবে—কেন এত মানুষ অন্য দেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চাইছেন, তাদের কতজনের আবেদন গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং কতজন শেষ পর্যন্ত শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছেন।