বিশ্বকে দেখার মানচিত্র বদলাল, সংকুচিত ইউরোপ-উত্তর আমেরিকা

৫০০ বছরের মানচিত্রে বদল, নতুন বিশ্ব মানচিত্রে বড় আফ্রিকা

৫০০ বছরের মানচিত্রে বদল, নতুন বিশ্ব মানচিত্রে বড় আফ্রিকা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ৫ সেপ্টেম্বর:

মানচিত্রে যে পৃথিবীকে মানুষ ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, সেটিই কি পৃথিবীর প্রকৃত চেহারা? উত্তরটা পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়। কারণ প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বহুল ব্যবহৃত একটি বিশ্বমানচিত্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে তাদের প্রকৃত আয়তনের তুলনায় বড় বা ছোট করে দেখিয়ে আসছে।

এই দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা বদলের পথে এবার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে জাতিসংঘ। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদে বিশ্বের মানচিত্রে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে তুলে ধরতে ‘Equal Earth’ ধরনের সমান-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে একটি প্রস্তাব বিপুল ভোটে অনুমোদিত হয়েছে।

প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি বাধ্যতামূলক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। কোনো দেশকে পুরোনো মানচিত্র ব্যবহার বন্ধ করতেও বলা হয়নি। বরং শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

কেন আফ্রিকা হঠাৎ এত বড় হয়ে গেল?

বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে Mercator projection। ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে এই মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। সমুদ্রপথে নৌযানের দিক নির্ধারণে এটি অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে তুলে ধরতে গিয়ে এতে আয়তনের বড় ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়।

ফলে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। বিপরীতে বিষুবরেখার কাছাকাছি আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চল তুলনামূলক ছোট মনে হয়।

সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা। প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আকারের মনে হতে পারে। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়

নতুন Equal Earth প্রজেকশন ২০১৮ সালে মানচিত্রবিদ টম প্যাটারসন, বার্নহার্ড জেনি ও বোয়ান শাভরিচ তৈরি করেন। এর প্রধান লক্ষ্য হলো পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি রাখা। ফলে নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়া তুলনামূলক বড় দেখাবে; ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দৃশ্যমান আয়তন কমে যাবে।

মানচিত্র কি শুধু ভূগোল?

এই প্রশ্নটিই নতুন বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রস্তাবটির উদ্যোক্তা টোগো ও আফ্রিকান দেশগুলো মনে করছে, মানচিত্র শুধু কোথায় কোন দেশ আছে তা শেখায় না; এটি মানুষের মনে বিশ্বের আকার, গুরুত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে। আফ্রিকার পক্ষে প্রচারণাকারীদের বক্তব্য, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মহাদেশটির আয়তন ছোট করে দেখানোর ফলে বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের মানসিক ধারণাতেও তার প্রভাব পড়েছে।

তবে সমালোচকদের যুক্তি, মানচিত্রের প্রতিটি প্রজেকশনেরই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। কোনো সমতল মানচিত্রেই পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সব দিক থেকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই Equal Earth-ও ‘সম্পূর্ণ নিখুঁত পৃথিবী’ নয়; এর মূল সুবিধা হলো মহাদেশগুলোর আয়তনের অনুপাত অনেক বেশি বাস্তবসম্মত রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

জাতিসংঘের ভোটে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ হিসেবে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংকটের বদলে এ ধরনের উদ্যোগ একটি আদর্শিক বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসছে।

অন্যদিকে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও উদ্যোগটির সমর্থকেরা ভোটের ফলকে দীর্ঘদিনের একটি বৈশ্বিক ধারণা সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখছে।

তবে পুরোনো মার্কেটর মানচিত্র একেবারে হারিয়ে যাচ্ছে না। বিশেষ করে নৌ ও বিমান চলাচলের মতো ক্ষেত্রে এর বিশেষ ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে। জাতিসংঘের প্রস্তাবও সেটি নিষিদ্ধ করেনি।

অর্থাৎ পৃথিবী বদলায়নি—বদলাতে শুরু করেছে পৃথিবীকে দেখার জানালাটি।

আর সেই জানালায় এবার আফ্রিকা আগের চেয়ে অনেকটাই বড়।