বাংলাদেশের জন্য চীনের সতর্কবার্তা

বিশ্বের কারখানা বলে খ্যাত চীনে এআইয়ের ধাক্কা: চাকরি হারাচ্ছে তরুণরা !

বিশ্বের কারখানা বলে খ্যাত চীনে এআইয়ের ধাক্কা: চাকরি হারাচ্ছে তরুণরা !

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৯ সেপ্টেম্বর:

স্বপ্ন নিয়ে চাকরিতে ঢুকেছিলেন ৪৪০ তরুণ। কিছুদিন পর ১০৭ জনের হাতে তুলে দেওয়া হলো ছাঁটাইয়ের খবর। কারও সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কারও সামনে আবার নতুন করে চাকরি খোঁজার লড়াই। বিশ্বের ‘কারখানা’ চীনে এআই ও অটোমেশনের বিস্তার শুধু উৎপাদন ব্যবস্থাই বদলাচ্ছে না—বদলে দিচ্ছে তরুণদের জীবন, স্বপ্ন ও নিরাপদ ভবিষ্যতের হিসাব।

চলতি বছর চীনে রেকর্ড ১ কোটি ২৭ লাখ গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু চাকরির সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার, শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে হিসাব করলে, জুলাইয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে; জুনে ছিল ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

চীনের চাংঝৌ শিংইউ অটোমোটিভ লাইটিং সিস্টেমসের ঘটনাটি এই সংকটের মানবিক মুখটি সামনে এনেছে।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালে ৪৪০ জন নতুন গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ করেছিল। নতুন চাকরি, আয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ছিল স্বপ্ন। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরপরই ১০৭ জনকে বাদ দেওয়া হয়

এক মুহূর্তে বদলে যায় তাদের জীবনের হিসাব। কেউ ক্ষতিপূরণ নিয়ে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তের সামনে পড়েন, কেউ উৎপাদন লাইনে অন্য ধরনের কাজ নেওয়ার সুযোগ পান। পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করে। কোম্পানিও ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে।

৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ১০৭ জনের মধ্যে ৭১ জন নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, ২২ জন আনুষ্ঠানিক চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন এবং ১৪ জন সাক্ষাৎকার, চাকরি খোঁজা বা উচ্চশিক্ষার পথ বিবেচনা করছিলেন।

এই সংখ্যাগুলোর পেছনে অবশ্যই ১০৭টি আলাদা জীবন আছে—কারও পরিবারের প্রত্যাশা, কারও ঋণ, কারও বিয়ের পরিকল্পনা, কারও বাবা-মায়ের কাছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি। প্রযুক্তির ভাষায় এটি হয়তো ‘কর্মী পুনর্বিন্যাস’; মানুষের জীবনে এটি হঠাৎ ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া।

উৎপাদন বাড়ছে, মানুষের জায়গা কমছে

চীনের গল্পের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। দেশটির শিল্প উৎপাদন ধসে পড়ছে না। বরং রোবট, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইন ও এআইয়ের ব্যবহার উৎপাদনকে আরও দ্রুত ও দক্ষ করে তুলছে।

কিন্তু যে কাজ করতে আগে অনেক শ্রমিক প্রয়োজন হতো, এখন একই কাজ কম মানুষ দিয়েই করা সম্ভব হচ্ছে।

২০১৩ সালের দিকে চীনের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান ছিল প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখ। পরবর্তী সময়ে তা কমে প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ উৎপাদন শক্তিশালী থাকার মধ্যেই শিল্পে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসন খাতের মন্দা, অর্থনৈতিক চাপ, উৎপাদন কাঠামোর পরিবর্তন ও ব্যবসায়িক ব্যয় কমানোর প্রবণতা। নির্মাণ খাতেও ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কমেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ চীনের সামনে এখন কঠিন এক বাস্তবতা—কারখানা থাকবে, উৎপাদন থাকবে, প্রযুক্তি বাড়বে; কিন্তু সবার জন্য আগের মতো চাকরি থাকবে না।

এআইয়ের সবচেয়ে বড় মানবিক প্রশ্ন

এখানে এআইকে একমাত্র দায়ী করলে ভুল হবে। অর্থনৈতিক মন্দা, আবাসন সংকট ও শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করছে।

তবু এআই ও অটোমেশন একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। বিশেষ করে এন্ট্রি-লেভেল চাকরি, যে কাজ দিয়ে তরুণরা কর্মজীবন শুরু করতেন, তার একটি অংশ এখন প্রযুক্তি করতে পারছে।

ফলে একজন তরুণের সামনে শুধু বেকার থাকার ভয় নয়; রয়েছে নিজের শিক্ষা ও দক্ষতা আদৌ ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে মূল্যবান থাকবে কি না—সেই অনিশ্চয়তাও।

চীনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় তাই পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে কোন দক্ষতার চাহিদা থাকবে, সেদিকে তরুণদের প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।

বাংলাদেশের জন্য চীনের সতর্কবার্তা

চীনের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের অর্থনীতির বড় অংশ এখনও শ্রমনির্ভর শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক খাত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

বাংলাদেশের কারখানাতেও অটোমেশন বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় কাটিং, আধুনিক মেশিন, রোবটিক প্রযুক্তি ও ডেটাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে কম শ্রমে বেশি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করবে।

এটি ঠেকানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে মানুষকে যদি অপ্রস্তুত রেখে দেওয়া হয়, তাহলে চীনের মতো সংকট বাংলাদেশের দরজায়ও কড়া নাড়তে পারে।

বাংলাদেশের তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এআইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হবে, নাকি মানুষকে এআইয়ের সঙ্গে কাজ করার মতো করে গড়ে তোলা হবে।

ডিগ্রি নয়, দক্ষতাও চাই

লাখ লাখ তরুণকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়ে কর্মবাজারে পাঠানো আর যথেষ্ট নয়।

এআই টুল ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার, ডিজিটাল যোগাযোগ, ইংরেজি, সমস্যা সমাধান এবং আধুনিক শিল্পপ্রযুক্তির ব্যবহারিক দক্ষতা শিক্ষার অংশ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও বাড়াতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী চাকরি খোঁজার সময় প্রথমবার বাস্তব প্রযুক্তির মুখোমুখি না হন।

শ্রমিককে বাদ নয়, নতুন কাজে প্রস্তুত করতে হবে

তৈরি পোশাকসহ শ্রমনির্ভর শিল্পে অটোমেশন বাড়লে প্রথম প্রতিক্রিয়া যেন ছাঁটাই না হয়।

একজন মেশিন অপারেটরকে স্বয়ংক্রিয় মেশিন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কাজে প্রশিক্ষিত করা সম্ভব।

সরকার ও শিল্পমালিকদের যৌথভাবে পুনঃদক্ষতা বা reskilling কর্মসূচি চালু করতে হবে। প্রযুক্তির কারণে একজন শ্রমিক যেন হঠাৎ আয়হীন না হন—এটাই হতে হবে নীতির কেন্দ্রবিন্দু।

কারণ একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ‘মানবসম্পদ ব্যয়’ নয়। এর সঙ্গে একটি পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে।

চীনের শিক্ষা, বাংলাদেশের প্রস্তুতি

চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয় তা হলো—প্রযুক্তি থামবে না; তাই মানুষকে থামিয়ে রাখা যাবে না।

এআই কিছু চাকরি কমাবে, আবার নতুন কাজও তৈরি করবে। প্রশ্ন হলো, নতুন কাজের জন্য আমাদের তরুণরা প্রস্তুত কি না।

আজ যে গ্র্যাজুয়েট শুধু একটি চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন, আগামী দিনের কর্মবাজারে তার প্রয়োজন হতে পারে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি এআই ব্যবহার করে আরও দ্রুত, দক্ষ ও সৃজনশীলভাবে কাজ করতে পারেন।

তাই বাংলাদেশের সামনে আসল লড়াই এআই বনাম মানুষ নয়।

লড়াই হলো—এআইয়ের যুগে মানুষকে অপ্রয়োজনীয় না করে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও সৃজনশীল এবং আরও মূল্যবান করে তোলা যায়।

চীনের কারখানায় আজ যে প্রশ্ন উঠেছে, কাল সেটি বাংলাদেশের কারখানাতেও উঠতে পারে—

কারখানা থাকবে। উৎপাদন থাকবে। কিন্তু মানুষের জীবনে কাজ থাকবে তো?