এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিপর্যয়: সর্বশেষ আপডেট
দ্বিতীয় দিনেও ভোগান্তি: ব্রিটেনে বাতিল প্রায় ২ হাজার ফ্লাইট
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ সেপ্টেম্বর:
যুক্তরাজ্যের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের জেরে দ্বিতীয় দিনেও স্বাভাবিক হয়নি বিমান চলাচল। মঙ্গলবারের কয়েক ঘণ্টার আইটি বিপর্যয়ে দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শত শত ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে এবং কয়েক লাখ যাত্রী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বুধবার সকালে ব্রিটেনের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচল আবার শুরু হলেও যাত্রীদের সতর্ক করা হয়েছে—বিমান ও ক্রু নির্ধারিত অবস্থানে না থাকায় আরও কয়েক দিন এর ‘নক-অন’ প্রভাব থাকতে পারে। হিথরো ও গ্যাটউইকসহ বড় বিমানবন্দরগুলো যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করতে বলেছে।

সমস্যার সূত্র কোথায় ?
বিপর্যয় শুরু হয় মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে। যুক্তরাজ্যের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস—NATS—জানায়, তাদের ফ্লাইট প্রসেসিং সিস্টেমে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছে।
প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টার পর সিস্টেমে সমাধান কার্যকর করা হয়। তবে ততক্ষণে বিমান চলাচলের পুরো নেটওয়ার্কে বড় ধরনের জট তৈরি হয়ে যায়। NATS বলেছে, সমস্যা সমাধানের পরও বিমান, ক্রু ও যাত্রীদের অবস্থান এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক সূচিতে ফিরতে সময় লাগবে।
প্রায় ২ হাজার ফ্লাইট বাতিল
বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান Cirium-এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ও বুধবার মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের বিমানবন্দরগুলোতে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
শুধু মঙ্গলবারই প্রায় ৫ হাজার ৮০০ নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭৫০টি বাতিল হয়েছিল। এর মধ্যে হিথরোতেই বাতিল হয়েছিল ৫৪১টি ফ্লাইট।
The Times-ও জানিয়েছে, বিমান ও ক্রু নির্ধারিত জায়গায় না থাকায় বাতিল ও বিলম্বের প্রভাব আরও কয়েক দিন চলতে পারে।

হিথরো, গ্যাটউইকসহ বড় বিমানবন্দরে প্রভাব
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে লন্ডনের হিথরো, গ্যাটউইক, স্ট্যানস্টেড ও লুটন বিমানবন্দরে। ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লন্ডন সিটি, ইস্ট মিডল্যান্ডস এবং দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
হিথরোতে একপর্যায়ে উড়োজাহাজের আগমন বন্ধ রাখতে হয়। বিমানবন্দরটি অতিরিক্ত উড়োজাহাজ গ্রহণ করতে না পারায় ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কিছু ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
বুধবার হিথরো জানিয়েছে, ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। তবে বিমান ও ক্রু পুনর্বিন্যাসের কারণে আরও বিঘ্ন ঘটতে পারে। গ্যাটউইকও জানিয়েছে, কার্যক্রম শুরু হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
রায়ানএয়ারের ২৬০ ফ্লাইট বাতিল
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এয়ারলাইনগুলোর একটি রায়ানএয়ার। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মঙ্গলবারের বিপর্যয়ে তাদের প্রায় ৪৮ হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ২৬০টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে।
রায়ানএয়ারের হিসাবে তাদের ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ড। প্রতিষ্ঠানটি আবারও NATS-এর প্রধান নির্বাহী মার্টিন রলফের পদত্যাগ দাবি করেছে।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ মঙ্গলবার ১০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল বা অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বুধবারও তাদের প্রায় ১৯০টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
NATS প্রধানকে তলব
পরিস্থিতি নিয়ে NATS-এর প্রধান নির্বাহী মার্টিন রলফকে তলব করেছেন পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার।
বুধবার রলফকে বিপর্যয়ের কারণ, সিস্টেমের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
আলেকজান্ডার বলেছেন, তিনি নিশ্চিত হতে চান যে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে এবং ব্রিটেনের বিমান চলাচল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য।
রলফের পদত্যাগ দাবি
বিপর্যয়ের পর NATS-এর নেতৃত্ব নিয়ে চাপ আরও বেড়েছে।
রায়ানএয়ারের পাশাপাশি উইজ এয়ারও NATS-এর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর সংস্কারের দাবি করেছে। উইজ এয়ারের যুক্তরাজ্য শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার পর নেতৃত্বের কাছ থেকে জবাবদিহি প্রয়োজন।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, এবার easyJet-ও NATS-এর নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রায়ানএয়ারের প্রধান নির্বাহী মাইকেল ও'লিয়ারি সরাসরি রলফকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
২০২৩ সালের ঘটনার সঙ্গে মিল নিয়ে বিতর্ক
এবারের ঘটনার সঙ্গে ২০২৩ সালের বড় ধরনের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিপর্যয়ের মিল আছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রায়ানএয়ার দাবি করছে, এবারও ফ্লাইট প্ল্যান প্রসেসিং-সংক্রান্ত একই ধরনের সমস্যা হয়েছে। তবে NATS প্রধান মার্টিন রলফ এই দাবি নাকচ করেছেন।
রলফের ভাষ্য, এবারের ঘটনা ২০২৩ সালের সমস্যার পুনরাবৃত্তি নয় এবং NATS-এর ৫০ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। তিনি জানিয়েছেন, সাইবার হামলার সম্ভাবনা ইতোমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।
NATS-ও বলেছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ২০২৩ সালের একই ত্রুটি হিসেবে দেখা হচ্ছে না এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।
২০২৩ সালের শিক্ষা কি কাজে আসেনি?
এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে বেশি উঠছে।
২০২৩ সালের আগস্টে NATS-এর একটি আইটি ব্যর্থতার কারণে ২ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল এবং প্রায় ৭ লাখ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক Civil Aviation Authority বা CAA NATS-এর জরুরি পরিকল্পনা ও প্রকৌশল সক্ষমতা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছিল।
এরপর ২০২৫ সালেও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থায় আরেকটি প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছিল।
ফলে তিন বছরের মধ্যে একাধিক বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর এখন প্রশ্ন উঠছে—দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জরুরি পরিকল্পনা আছে কি না।
তদন্ত করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা
Civil Aviation Authority ইতোমধ্যে NATS-এর কাছে পূর্ণাঙ্গ ঘটনা প্রতিবেদন চেয়েছে।
প্রতিবেদন পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ করতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করবে CAA।
NATS জানিয়েছে, তারা তদন্ত করে সমস্যার প্রকৃত কারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করবে।
যাত্রীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিমান চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। হিথরো ও গ্যাটউইকসহ বিমানবন্দরগুলো যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
কারণ মঙ্গলবারের বিপর্যয়ে বহু বিমান ও ক্রু ভুল জায়গায় আটকা পড়েছে। ফলে কোনো একটি বিমানবন্দরে NATS-এর সিস্টেম স্বাভাবিক থাকলেও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নিজস্ব সূচিতে বিলম্ব বা বাতিলের ঘটনা ঘটতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি
প্রযুক্তিগত ত্রুটি সমাধান হয়েছে—কিন্তু তার তৈরি করা বিশাল জট এখনও কাটেনি। প্রায় ২ হাজার ফ্লাইট বাতিল, শত শত ফ্লাইট বিলম্ব, বিমান ও ক্রুর অবস্থান পরিবর্তন এবং যাত্রীদের পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে ব্রিটেনের বিমান চলাচল ব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে।
আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—তিন বছরের মধ্যে বারবার এমন বিপর্যয়ের পরও যদি একই ধরনের সমস্যা ফিরে আসে, তাহলে ব্রিটেনের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নেতৃত্বের জবাবদিহি কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন NATS, সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।