ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

ব্রিটেনের যে ‘ভূতের শহরে’ ঢুকতে অনুমতি লাগে!

ব্রিটেনের যে ‘ভূতের শহরে’ ঢুকতে অনুমতি লাগে!

বিচিত্র খবর ডেস্ক, ১২ আগস্ট:

ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারের একটি গ্রাম। একসময় সেখানে ছিল মানুষের বসতি, গির্জা, স্কুল, দোকান, পাব ও কর্মচাঞ্চল্য। এখন সেখানে পড়ে আছে পরিত্যক্ত বাড়িঘর, সামরিক প্রশিক্ষণের ধ্বংসাবশেষ আর নীরবতা। নাম ইমবার (Imber)—ব্রিটেনের একমাত্র সরকারি ‘ঘোস্ট টাউন’ হিসেবে পরিচিত এই গ্রামে সাধারণ সময়ে প্রবেশই নিষিদ্ধ।

সালিসবারি প্লেইনের বিশাল সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকার মধ্যে অবস্থিত ইমবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে জনশূন্য। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাটিতে নিয়মিত সামরিক মহড়া হয়। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকি থাকায় দর্শনার্থীদের নির্ধারিত পথের বাইরে যাওয়ারও অনুমতি নেই।

তবে ইতিহাসের বিশেষ এই গ্রামটি বছরে হাতে গোনা কয়েকটি দিনে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। চলতি বছর ২৯ থেকে ৩১ আগস্টও ইমবার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

যুদ্ধের প্রয়োজনে উচ্ছেদ

ইমবারের ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো। ৯৬৭ সালের নথিতে গ্রামটির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ডোমসডে বুকেও এর নাম রয়েছে। একসময় সেখানে দুটি গির্জা, দুটি জমিদারবাড়ি, একটি পাব, স্কুল, কামারের দোকান ও খামার ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গ্রামটির চেহারা বদলে দেয়।

১৯৪৩ সালের ১ নভেম্বর ইমবারের ১৫২ বাসিন্দাকে স্কুল ভবনে ডেকে জানানো হয়, বড়দিনের আগেই তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হবে। মাত্র ৪৭ দিনের মধ্যে তাদের গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ডি-ডে অভিযানের আগে মার্কিন সেনাদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ইমবার ও আশপাশের এলাকা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

বাসিন্দারা সামান্য অর্থ পেলেও হারানো ব্যবসা বা নতুন বাসস্থানের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ পাননি। তাদের বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর তারা ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ইমবার স্থায়ীভাবেই ব্যবহার করা হবে।

ফিরে আসার অপেক্ষা আর শেষ হয়নি

গ্রামবাসীরা অবশ্য বিষয়টি মেনে নেননি। ১৯৬১ সালে প্রায় দুই হাজার মানুষ তাদের পক্ষে আয়োজিত একটি গণসমাবেশে অংশ নেন। এমনকি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষেও গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীকে ইমবার ব্যবহারের অনুমতি বহাল রাখা হয়।

উচ্ছেদের ঘটনায় গ্রামটির মানুষের জীবনে যে ধাক্কা নেমে এসেছিল, তার স্মৃতিও রয়ে গেছে। সাবেক বাসিন্দাদের বর্ণনায় জানা যায়, অনেকেই এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে যুদ্ধ শেষে ফিরে আসবেন যে ঘরের আলমারিতে নিজেদের জিনিসপত্র পর্যন্ত রেখে গিয়েছিলেন।

আজ সেই বাড়িগুলোর অধিকাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত। সামরিক মহড়ার কারণে কিছু ভবন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এলাকাজুড়ে পুরোনো সামরিক যান ও প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত স্থাপনার চিহ্নও দেখা যায়।

তবে ১৩ শতকের সেন্ট গাইলস চার্চ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। পরিত্যক্ত গ্রামের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অক্ষত স্থাপনা।

বছরে কয়েক দিনের জন্য খুলে যায় ‘নিষিদ্ধ’ গ্রাম

ইমবারে সাধারণ সময়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও নির্দিষ্ট কিছু দিনে দর্শনার্থীরা সেখানে যেতে পারেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনগুলোর একটি হলো Imberbus Day

২০০৯ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন এখন বড় দাতব্য অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পুরোনো ও ঐতিহাসিক বাসে করে দর্শনার্থীদের সালিসবেরি প্লেইন পেরিয়ে ইমবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত বছর এই আয়োজনে চার হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন এবং প্রায় ৩৭ হাজার পাউন্ড দাতব্য অর্থ সংগ্রহ হয়। এবারের আয়োজনে ৪০টির বেশি পুরোনো বাস অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে ইমবারে ভ্রমণ নিছক পর্যটন নয়। এটি একই সঙ্গে যুদ্ধের ইতিহাস, উচ্ছেদ হওয়া একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি এবং ব্রিটেনের সামরিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

সাধারণ মানুষের চোখে ইমবার আজ একটি ‘ভূতের শহর’। কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলোর আড়ালে এটি আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া জনপদের গল্প—যেখানে যুদ্ধের প্রয়োজনে ১৫২ মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, কিন্তু তাদের ফেরার পথ আর কখনো খোলেনি।