ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৯ ।। বাংলাদেশে তরুণদের ভবিষ্যৎ ও বাস্তবতা
উৎসর্গ
“বেকারত্ব, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়ে যাওয়া
বাংলাদেশের তরুণদের প্রতি—যারা হার মানেনি”

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কী—এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা প্রায়ই জনসংখ্যার তরুণ অংশের কথা বলি। বলা হয়, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের জনমিতিক লভ্যাংশের বড় সুযোগ। কথাটি সত্য। কিন্তু একটি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন তাদের সামনে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বাস্তব সুযোগ থাকে।
অন্যথায় তরুণ জনসংখ্যা সম্ভাবনার পাশাপাশি হতাশারও বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
আজ বাংলাদেশের তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভবিষ্যৎটা আসলে কোথায়?
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করছেন। পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের স্বপ্ন আর কয়েক বছরের পড়াশোনার বিনিময়ে তিনি একটি ভালো চাকরি চান। কিন্তু সনদ হাতে পাওয়ার পরই বুঝতে পারেন, তার জন্য অপেক্ষা করছে দীর্ঘ প্রতিযোগিতা। একটি চাকরির পেছনে হাজার হাজার আবেদনকারী। লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, আবার অপেক্ষা।
অনেকে বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করে দেন।
অন্যদিকে যারা কোনোভাবে কাজ পাচ্ছেন, তাদের একটি অংশ এমন কাজে যুক্ত হচ্ছেন, যা তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থাৎ চাকরি আছে, কিন্তু যোগ্যতার যথাযথ মূল্য নেই।
এখানেই বাংলাদেশের তরুণদের বাস্তবতার একটি বড় সংকট।
শিক্ষা কি কর্মজীবনের প্রস্তুতি দিচ্ছে?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে দূরত্ব। একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পাঠ্যবই পড়ছেন, পরীক্ষা দিচ্ছেন, সনদ অর্জন করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর তাকে নতুন করে শিখতে হচ্ছে—কীভাবে কাজ করতে হয়, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, যোগাযোগ করতে হয়, সমস্যা সমাধান করতে হয়।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে জীবন ও কর্মের জন্য প্রস্তুত করা।
বিশ্বের কর্মবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস, ডিজিটাল অর্থনীতি—এসব আগামী দিনের চাকরির ধরন বদলে দেবে। বাংলাদেশ যদি এখনো শুধু প্রচলিত শিক্ষার ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে আমাদের তরুণদের প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।
তাই তরুণদের শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
ঠিকানা কেন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
ঢাকার একজন তরুণ এবং কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের একজন তরুণ একই দেশের নাগরিক। কিন্তু তাদের সুযোগ কি একই?
ঢাকার শিক্ষার্থী সহজে কোচিং, প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, ইন্টারনেট, ইন্টার্নশিপ কিংবা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু চরাঞ্চলের একজন মেধাবী তরুণকে অনেক সময় এসব সুযোগের জন্য দূরের শহরে যেতে হয়।
সুনামগঞ্জের হাওরের একজন তরুণীর জন্য বর্ষাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সাতক্ষীরার উপকূলের একজন তরুণের কাছে লবণাক্ততা শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি তার পরিবারের কৃষি ও জীবিকার প্রশ্ন। ভোলার কোনো তরুণ নদীভাঙনের কারণে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হতে পারেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের তরুণদের বাস্তবতা এক নয়।
তাদের স্বপ্ন একই হতে পারে, কিন্তু সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর রাস্তা সবার জন্য সমান নয়।
এ বৈষম্য দূর করা না গেলে জন্মস্থানই একসময় একজন তরুণের ভবিষ্যতের সীমারেখা হয়ে দাঁড়াবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণদের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের উপকূল, চর ও হাওর অঞ্চলের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নদীভাঙনে ঘর হারানো, লবণাক্ততায় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদ নষ্ট হওয়া কিংবা বন্যায় শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া—এসব কোনো দূর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। অনেক তরুণের জন্য এগুলো বর্তমান বাস্তবতা।
একটি দুর্যোগ একটি পরিবারের আয় বন্ধ করে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যেতে হতে পারে। কেউ শহরে চলে আসতে পারেন, কেউ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যুবনীতিতে তাই জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো খাতেও তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ, কিন্তু কার জন্য?
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেই ডিজিটাল বৈষম্য শেষ হয়ে যায় না।
একজন শহুরে তরুণের হাতে আধুনিক স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। একই দেশের আরেক তরুণ হয়তো একটি সাধারণ স্মার্টফোন দিয়ে সীমিত ডেটায় ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন।
দুজনই অনলাইনে আছেন। কিন্তু দুজনের ডিজিটাল সামর্থ্য এক নয়।
আগামী দিনের চাকরির বাজারে এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এআই ব্যবহার করতে জানেন এমন একজন তরুণ একই সময়ে অন্যদের তুলনায় বেশি কাজ করতে পারবেন। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা তরুণ পিছিয়ে পড়বেন।
তাই ডিজিটাল সংযোগ এখন শুধু যোগাযোগের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সুযোগেরও বিষয়।
তরুণ নারীদের সামনে আরও বেশি বাধা
বাংলাদেশের তরুণ নারীদের বাস্তবতা আরও জটিল।
শিক্ষা শেষ করেও অনেক নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। নিরাপদ যাতায়াত, পরিবারের মানসিকতা, সামাজিক বিধিনিষেধ, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব তাদের কর্মজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একজন তরুণ পুরুষ যে সিদ্ধান্তটি সহজে নিতে পারেন, একজন তরুণ নারীকে অনেক সময় সেই সিদ্ধান্ত নিতে পরিবার ও সমাজের নানা বাধা অতিক্রম করতে হয়।
তাই নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু নতুন চাকরি তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নিরাপদ যাতায়াত, কর্মজীবী মায়েদের সহায়তা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
বিদেশমুখী স্বপ্নের পেছনে কী আছে?
বাংলাদেশের অনেক তরুণের কাছে বিদেশে যাওয়া এখন শুধু স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি প্রধান পথ।
দেশে ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন, আয় সীমিত এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান কম—এমন বাস্তবতা অনেক তরুণকে বিদেশমুখী করছে।
কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পথও সবসময় নিরাপদ নয়। অভিবাসন ব্যয় বেশি, দালালের প্রতারণা, দক্ষতার ঘাটতি এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ অনেক তরুণের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
তাই বিদেশে কর্মসংস্থানকে শুধু কতজন শ্রমিক পাঠানো হলো—এই হিসাব দিয়ে দেখা যাবে না। কতজন দক্ষ কর্মী গেলেন, তারা কত আয় করছেন এবং তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে ভবিষ্যৎ কোথায়?
বাংলাদেশের তরুণদের সামনে সংকট আছে, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়।
দেশের তরুণরা প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী, উদ্যোক্তা হতে চায়, নতুন কিছু শিখতে চায়, বিশ্ববাজারে কাজ করার স্বপ্ন দেখে। প্রয়োজন শুধু তাদের সামনে দরজা খুলে দেওয়া।
শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ জেলা-উপজেলা পর্যন্ত নিতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন দিতে হবে। শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ও এআই শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাম, চর, হাওর ও উপকূলের তরুণদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তরুণদের শুধু ভোটার, চাকরিপ্রার্থী কিংবা জনসংখ্যার একটি অংশ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের নীতিনির্ধারণের অংশীদার করতে হবে।
কারণ তরুণদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন শুধু বয়স্করা—এ ধারণা বদলাতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটি আসলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে—তারই পূর্বাভাস।
তাদের হাতে যদি দক্ষতা থাকে, কিন্তু কাজ না থাকে—হতাশা তৈরি হবে। কাজ থাকে, কিন্তু মর্যাদা না থাকে—অসন্তোষ তৈরি হবে। প্রযুক্তি থাকে, কিন্তু সুযোগের সমতা না থাকে—বৈষম্য বাড়বে। আর স্বপ্ন থাকে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ না থাকে—একসময় স্বপ্নটাই দেশ ছাড়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করছি, যেখানে একজন তরুণ তার ভবিষ্যৎ খুঁজতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন না?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়, পুরো সমাজের।
কারণ বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কোনো দূরের বিষয় নয়। তাদের ভবিষ্যতের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন,১৩ আগস্ট, ২০২৬