ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাংলাদেশের সামনে বড় অর্থনৈতিক ও খাদ্যঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাংলাদেশের সামনে বড় অর্থনৈতিক ও খাদ্যঝুঁকি

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১২ সেপ্টেম্বর :

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা নেওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও নৌপরিবহন বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। হুতিদের পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ, বাব এল-মান্দেবের নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধের ঘটনায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে একাধিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

১. জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে
তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে একই পরিমাণ তেল, গ্যাস ও জ্বালানি কিনতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হবে। আইইএ বলছে, সংঘাতের কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

২. ডলারের ওপর চাপ বাড়বে
জ্বালানি আমদানি বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে। এতে রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং সরকারের ভর্তুকির ব্যয়ও বাড়তে পারে।

৩. পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
তেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক, লরি ও নৌপরিবহনের খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দামে। আন্তর্জাতিক জাহাজভাড়াও ইতোমধ্যে বেড়েছে।

৪. বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে
বাংলাদেশ আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে।

৫. শিল্পে ‘ডাবল চাপ’
জ্বালানি, কাঁচামাল ও পরিবহন—তিন দিক থেকেই খরচ বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। দীর্ঘ সংকটে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৬. তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাড়তি খরচ
বাব এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়লে জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে সময়, জ্বালানি, বীমা ও জাহাজভাড়া বাড়বে। বাংলাদেশের ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানিও এর প্রভাবে পড়তে পারে।

৭. কৃষিতে সারের চাপ
জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের কারণে সারের দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।

৮. জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমার ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘ হলে বেশি আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ ও রপ্তানি ব্যয়ের কারণে প্রবৃদ্ধি আরও কমতে পারে।

৯. আঘাত যাবে সাধারণ মানুষের পকেটে
জ্বালানি থেকে পরিবহন, পরিবহন থেকে উৎপাদন এবং উৎপাদন থেকে খাদ্যের দাম—পুরো চেইনেই খরচ বাড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে।

১০. খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি
জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি, খাদ্য আমদানির ব্যয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া একসঙ্গে ঘটলে খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল হতে পারে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে।

দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?

এখনই বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো তথ্য নেই। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যদি জ্বালানি, সার, খাদ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়, একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান কমে যায়, তাহলে গুরুতর খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা এখনই নিশ্চিত করে বলা না গেলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি দেশে না হলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত এসে পড়তে পারে জ্বালানি, ডলার, বিদ্যুৎ, শিল্প, রপ্তানি, কৃষি, খাদ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।