বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে শত শত বেকারি বন্ধের পথে—বেকার হবার ঝুঁকিতে শত শত কর্মচারি
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
ময়দা, চিনি, তেল ও ডালডার দাম বৃদ্ধি, সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি বেকারি শিল্প এখন বড় সংকটে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, উৎপাদন কমেছে, বাড়ছে বেকারি পণ্যের দাম। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে শত শত ছোট বেকারি।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত এক বছরে বেকারি পণ্য তৈরির খরচ বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। বিপরীতে উৎপাদন কমেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী ছয় মাসে দেশের ৫০০ থেকে ৬০০টি ছোট বেকারি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে শিল্পসংশ্লিষ্টরা। ঢাকাতেই গত ছয় মাসে প্রায় ২০টি বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে।
এর প্রভাব শুধু ব্যবসার ওপর পড়ছে না। বেকারি শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে শ্রমিক, কারিগর, ডেলিভারি কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ছোট ব্যবসাগুলোর ওপরও তার প্রভাব পড়বে। ফলে একটি খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের সংকটেও পরিণত হতে পারে।
রুটির দাম বাড়ছে, কমছে ওজন
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। রুটি, বনরুটি, বিস্কুট বা কেক অনেক শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন খাবারের সহজলভ্য অংশ। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেকারি মালিকদের সামনে এখন দুটি পথ—দাম বাড়ানো অথবা একই দাম রেখে পণ্যের ওজন কমানো।
১২ সেপ্টেম্বর থেকে বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিছু পণ্যের দাম না বাড়িয়ে ওজন কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১০ টাকার রুটি হয়তো ১০ টাকাই থাকবে, কিন্তু আগের তুলনায় কম ওজনের হবে।
এদিকে বাজারে ময়দা ও চিনির দামও দ্রুত বেড়েছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের ব্যবধানে খুচরা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে চিনি কেজিপ্রতি প্রায় ১১০–১২০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৬৫–৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা এখন প্রায় ৩ হাজার ১০০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা। একই সময়ে ৫০ কেজি চিনির দাম প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা বেড়েছে। ১৬ কেজির ডালডার কার্টন ও ১৮৫ কেজির সয়াবিন তেলের ড্রামের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন বন্ধ
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নতুন সংকট তৈরি করেছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক কারখানায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে বেশি খরচের এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের একটি বেকারিতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শ্রমিকের বেতন, ভাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বহন করতে হচ্ছে। ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই বলছেন, লোকসান সামাল দিতে গিয়ে তাঁদের মূলধন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার কে?
এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে সহজ—নিম্নআয়ের মানুষ এবং বেকারি শ্রমিক।
একজন শ্রমিকের কাছে ১০ টাকা বাড়তি খরচও গুরুত্বপূর্ণ। আবার একটি ছোট বেকারি বন্ধ হলে সেই শ্রমিকের দৈনিক আয়ই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ একই সংকটের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ। একদিকে রুটির দাম বাড়ছে বা ওজন কমছে, অন্যদিকে সেই রুটি তৈরি করা মানুষের চাকরিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে দেশে প্রায় ৭ হাজার ক্ষুদ্র বেকারি রয়েছে। শিল্পটির বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে আগামী ছয় মাসে প্রায় ১০ শতাংশ বেকারি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির নেতারা।
এখন প্রশ্ন শুধু রুটির দাম কত হবে তা নয়। প্রশ্ন হলো—যে মানুষটি রুটি কিনবেন এবং যে শ্রমিকটি রুটি তৈরি করবেন, দুজনের জীবনযাত্রার ওপরই যদি একই সংকট আঘাত হানে, তাহলে অর্থনীতির নিচের স্তরের মানুষ কতদিন এই চাপ সামলাতে পারবেন?
বেকারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাঁচামালের বাজার, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন—এই তিন জায়গায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আজকের মূল্যবৃদ্ধি আগামী দিনে আরও বড় খাদ্য ও কর্মসংস্থান সংকটে রূপ নিতে পারে।