ব্রিটেন সংবাদ
আয়ারল্যান্ডে ট্রাম্পবিরোধী ১০ হাজারের বেশি মানুষের মিছিল, ‘ইউনাইটেড আয়ারল্যান্ড’ মন্তব্যে ব্রিটেনে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফর ঘিরে ডাবলিনে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কেন্দ্রীয় সড়কে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মিছিল করে তাঁর সফরের প্রতিবাদ জানান। একই দিনে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিহল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, তিনি আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডকে একীভূত হয়ে একটি দেশ হিসেবে দেখতে চান। ফলে তাঁর সফর ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
‘নো ওয়েলকাম ফর ট্রাম্প’ স্লোগানে আয়োজিত মিছিলটি গার্ডেন অব রিমেমব্রেন্স থেকে শুরু হয়ে ডাবলিনের কেন্দ্রীয় এলাকা পেরিয়ে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে যায়। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাকার্ড ও ফিলিস্তিনি পতাকা। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি, গাজা, ইরান এবং আয়ারল্যান্ডের সামরিক নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

বিক্ষোভের রাজনৈতিক বার্তাও ছিল স্পষ্ট—ট্রাম্পের নীতি ও তাঁর আন্তর্জাতিক ভূমিকার বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের একটি বড় অংশের আপত্তি রয়েছে। এর আগেই আয়োজকেরা ‘নো ওয়েলকাম ফর ট্রাম্প’ কর্মসূচিতে হাজারো মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
এর মধ্যেই ট্রাম্প ডাবলিনে প্রধানমন্ত্রী মিহল মার্টিনের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে চান। তাঁর দাবি, একসময় এই ঐক্য ঘটবেই এবং এখন ঘটলে সেটিও ভালো হবে। ট্রাম্প অবশ্য বলেন, তিনি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না এবং এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যেরও বলার অধিকার রয়েছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য দ্রুত ওয়েস্টমিনস্টারে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক তাঁর বক্তব্যকে ‘গভীরভাবে অপ্রয়োজনীয়’ বলে সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন মন্তব্য উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ব্যাডেনক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছ থেকে ইউনিয়ন রক্ষার বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান দাবি করেছেন।
ডাউনিং স্ট্রিট অবশ্য জানিয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বার্নহামের অবস্থান—বর্তমানে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা করার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন নেই; সেই পরিস্থিতি না বদলালে নতুন গণভোটের প্রশ্নও নেই।
ইউনিয়নিস্ট নেতারাও ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা গ্যাভিন রবিনসন বলেছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন সেখানকার জনগণ—লন্ডন, ডাবলিন কিংবা ওয়াশিংটনের কোনো নেতা নয়।

অন্যদিকে আইরিশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ট্রাম্পের মন্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। সিন ফেইনের নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, আয়ারল্যান্ডের ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের গণতান্ত্রিক মতামতই মূল বিষয়। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য নিজে কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটায় না; কিন্তু এটি দীর্ঘদিনের সংবেদনশীল প্রশ্নটিকে আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
একদিকে ডাবলিনের রাস্তায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ, অন্যদিকে তাঁর মুখে ‘ইউনাইটেড আয়ারল্যান্ড’-এর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান—সব মিলিয়ে আয়ারল্যান্ড সফরটি শুধু মার্কিন-আইরিশ সম্পর্কের কূটনৈতিক সফর থাকেনি। এটি একই সঙ্গে গাজা ও যুদ্ধনীতি, আইরিশ নিরপেক্ষতা এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।