ব্রিটেন সংবাদ

ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের নতুন রূপ—ডানপন্থী রাজনীতি কি নতুন ঝুঁকির দিকে?

ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের নতুন রূপ—ডানপন্থী রাজনীতি কি নতুন ঝুঁকির দিকে?

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :

ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন কি শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার কয়েকশ বিক্ষোভকারী ও পাল্টা-বিক্ষোভকারীর মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে পুলিশকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এর মধ্যেই আরও বড় একটি তথ্য সামনে এসেছে। গত ১৮ মাসে যুক্তরাজ্যে অন্তত ২৮টি নতুন anti-migrant vigilante group বা অভিবাসনবিরোধী স্বঘোষিত পাহারাদার গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বলে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম ছোট স্থানীয় পাহারা থেকে শুরু করে বন্দর ও সড়ক অবরোধ পর্যন্ত বিস্তৃত। কিছু গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনভঙ্গ ও জননিরাপত্তার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

প্রতিবাদের ধরনও বদলাচ্ছে

নতুন এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ Patriot Platform। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কালো পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তারা নিজেদের অভিবাসন ঠেকাতে সংগঠিত ‘দেশপ্রেমিক’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় লোক জড়ো করছে।

গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ব্রিটিশ far-right রাজনীতিতে একটি নতুন সাংগঠনিক পদ্ধতি দেখা যাচ্ছে—কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলের প্রচলিত সমাবেশের পরিবর্তে ছোট ছোট আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, অনলাইন যোগাযোগ এবং দ্রুত সংগঠিত দল মাঠে নামছে।

পুলিশের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ

বিক্ষোভের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, কিছু গোষ্ঠী নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে। পোর্টসমাউথে পুলিশকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

সরকার এই ধরনের আচরণকে ‘ভয় দেখানো’ ও উচ্ছৃঙ্খলতার সঙ্গে তুলনা করেছে। একই সঙ্গে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আগাম প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডোভার ও পোর্টসমাউথের ঘটনার পর পুলিশকে ভবিষ্যৎ বিক্ষোভ সম্পর্কে আরও কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরেকটি বিপজ্জনক দিক—RNLI-ও টার্গেট

অভিবাসন ইস্যুর উত্তেজনা এখন ব্রিটেনের বহুল সম্মানিত উদ্ধারকারী সংস্থা RNLI-এর স্বেচ্ছাসেবীদেরও আঘাত করছে। ইংলিশ চ্যানেল থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধার করা RNLI কর্মীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে অপমান, পরিচয় প্রকাশের চেষ্টা এবং হুমকির অভিযোগ উঠেছে। RNLI-এর প্রধান নির্বাহী এই আচরণকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা করেছেন।

এখানেই বিষয়টি শুধু অভিবাসননীতির বিতর্ক থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে—একটি রাজনৈতিক ইস্যু ঘিরে সাধারণ নাগরিক, উদ্ধারকর্মী, পুলিশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যদি ভয় ও সংঘাত তৈরি হয়, তাহলে ব্রিটিশ সামাজিক সংহতির ওপর তার প্রভাব কতটা হতে পারে?

তাহলে কি ডানপন্থী রাজনীতি নতুন ঝুঁকির দিকে?

অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগকে গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ করা ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার। ছোট নৌকায় অবৈধভাবে প্রবেশ, আশ্রয়ব্যবস্থার চাপ কিংবা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও রাজনৈতিক বিতর্কের বৈধ অংশ।

কিন্তু রাজনৈতিক দাবি যখন মুখোশধারী দল, স্বঘোষিত vigilante বাহিনী, রাস্তা অবরোধ, উদ্ধারকর্মীদের হুমকি কিংবা নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতায় রূপ নেয়, তখন বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়।

ব্রিটেনের সামনে এখন তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনগণের অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগের রাজনৈতিক সমাধান করতে হবে; অন্যদিকে সেই উদ্বেগকে ব্যবহার করে কোনো গোষ্ঠী যেন আইনশৃঙ্খলার বিকল্প শক্তিতে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব—রাস্তায় গড়ে ওঠা স্বঘোষিত বাহিনীর নয়।

১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিটেনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু ‘অভিবাসন কতটা নিয়ন্ত্রণ করা হবে’ নয়; বরং অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সমাজে নতুন ধরনের সংঘাত ও vigilante রাজনীতি তৈরি হচ্ছে কি না।