ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
দিল্লিতে তিন প্রেসিডেন্ট, নিরাপত্তার নিচে চাপা পড়েছে পুরো শহর
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১২ সেপ্টেম্বর :
একজন রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তায় কত মানুষ লাগে?
কয়েকজন দেহরক্ষী? একটি সাঁজোয়া গাড়ি? কয়েকটি পুলিশ ভ্যান?
নয়াদিল্লির বর্তমান চিত্র বলছে—না, ব্যাপারটি এখন আর এত সহজ নয়।
ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদি একই সময়ে দিল্লিতে। তিনজনই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে। তাদের ঘিরে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি দেখলে মনে হতে পারে—একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়, যেন একটি শহরকে সাময়িকভাবে একটি বিশাল নিরাপত্তা দুর্গে পরিণত করা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি বন্দুক নয়।
ভয়ংকর বিষয় হলো—কোথা থেকে বিপদ আসতে পারে, সেটিই নিশ্চিত নয়।
পুতিনের সঙ্গে রাশিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চীনের নিজস্ব নিরাপত্তা দল। মোদির পাশে ভারতের এসপিজি। এর বাইরে দিল্লি পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষায়িত বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ইউনিট।
অর্থাৎ একজন নেতাকে নিরাপদ রাখতে আরেকটি দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা হচ্ছে না।
প্রত্যেক নেতা যেন নিজের সঙ্গে একটি ছোট রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-দুর্গ নিয়ে চলছেন।

গাড়িও এখানে নিরাপত্তার অস্ত্র
পুতিনের অরাস সেনাটকে বাইরে থেকে একটি বিলাসবহুল কালো গাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে প্রেসিডেন্টের সুরক্ষিত চলাচলের ধারণা।
শির বহরেও রয়েছে সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় যান।
কারণ আধুনিক নিরাপত্তায় গাড়ি শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়—এটি নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অংশ।
একজন নেতা যখন গাড়িতে ওঠেন, তখন তার সঙ্গে শুধু চালক নয়; সামনে-পেছনে নিরাপত্তা, নির্ধারিত রুট, বিকল্প রুট এবং পথের ওপর নজরদারি—সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করে।
আসল নিরাপত্তা শুরু হয় হোটেল থেকে
নিরাপত্তার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো—নেতারা যেখানে থাকছেন, সেই হোটেলও কার্যত নিরাপত্তা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
শির অবস্থান ঘিরে নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত নিরাপত্তা জোরদারের কথা প্রতিবেদনে এসেছে।
হোটেলের কর্মীদের পরিচয় ও অতীত যাচাই করা হয়েছে। কারণ নিরাপত্তার যুক্তি হলো—একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর জন্য হামলাকারীকে সরাসরি তার সামনে দাঁড়াতেই হবে এমন নয়।
সেই ব্যক্তির আশপাশের ব্যবস্থার দুর্বলতাও সম্ভাব্য ঝুঁকি হতে পারে।
তাই নিরাপত্তার চোখে—
হোটেলের দরজা, কর্মচারী, লিফট, ছাদ, গাড়ি, রাস্তা—কিছুই ‘সাধারণ’ থাকে না।
৩৫টি রুট কেন?
ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে ১১টি হোটেল ও ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নিরাপত্তার আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই বোঝা যায় একজন রাষ্ট্রপ্রধানের চলাচল আসলে কত বড় একটি অভিযান।
তিনি যে রাস্তা দিয়ে যাবেন, শুধু সেই রাস্তা নিরাপদ করলেই হয় না। আশপাশের পরিবেশ, সম্ভাব্য প্রবেশপথ এবং বিকল্প পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
অর্থাৎ একটি গাড়ির কয়েক মিনিটের যাত্রার পেছনে প্রস্তুতি চলতে পারে অনেক আগে থেকেই।
আকাশ থেকেও বিপদ আসতে পারে
নিরাপত্তা এখন মাটিতে আটকে নেই।
ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন ধরনের হুমকি শনাক্তের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনাও নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে এমন হামলার কোনো নির্দিষ্ট হুমকি রয়েছে।
বরং আধুনিক নিরাপত্তার দর্শন হলো—
যে বিপদ ঘটতে পারে, সেটিকে ঘটার আগেই হিসাবের মধ্যে রাখা।
নিরাপত্তার সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা কোথায়?
সম্ভবত সেই জায়গায়, যেটি সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না।
একজন নেতা মঞ্চে বসেছেন—এটাই দৃশ্যমান অংশ।
কিন্তু তার আগে কত মানুষ যাচাই হয়েছে, কত গাড়ি পরীক্ষা হয়েছে, কত রাস্তা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, কত সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়েছে—এসবের অধিকাংশই সাধারণ মানুষের চোখের বাইরে।
১০০টির বেশি প্রশিক্ষিত কুকুর, শতাধিক বিশেষ কমান্ডো, পুলিশ, গোয়েন্দা ও বিদেশি নিরাপত্তা দল—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা।
এ যেন একটি মানুষের চারপাশে নয়, একটি সম্ভাব্য বিপদের চারপাশে নিরাপত্তা তৈরি করা।
একটিমাত্র ভুলের সুযোগ নেই
মোদির নিরাপত্তায় ‘জিরো এরর’ নীতির কথা বলা হয়েছে।
এই ধারণাটিই বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কারণ একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিরাপত্তার ব্যর্থতা শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করতে পারে না; এর প্রভাব পড়তে পারে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ওপর।
তাই পুতিনের নিরাপত্তা রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শির নিরাপত্তা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মোদির নিরাপত্তা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তিনজন যখন একই শহরে, তখন তাদের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
দিল্লির এই দৃশ্য ভবিষ্যতের পৃথিবীর সংকেত
নয়াদিল্লির নিরাপত্তা আয়োজন আসলে একটি বড় পরিবর্তনের ছবি দেখাচ্ছে।
বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতারা যত বেশি সংঘাত, যুদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর হামলা ও অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের নিরাপত্তাও তত বেশি জটিল হচ্ছে।
আগে নিরাপত্তা মানে ছিল—কাউকে কাছে আসতে না দেওয়া।
এখন নিরাপত্তা মানে—
কেউ কোথায় আছে, কীভাবে আসছে, কী ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন পথ দিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটার আগেই সেটি শনাক্ত করা।
এই কারণেই পুতিনের গাড়ি শুধু গাড়ি নয়।
শির হোটেল শুধু হোটেল নয়।
মোদির নিরাপত্তাকর্মী শুধু দেহরক্ষী নন।
আর দিল্লির ৩৫টি নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত রুট শুধু রাস্তা নয়।
সব মিলিয়ে এগুলো একটি বার্তা দেয়—
আজকের পৃথিবীতে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে নিরাপদ রাখা মানে তার চারপাশের পুরো পরিবেশকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা।
আর সবচেয়ে বড় বিস্ময়টি এখানেই—
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাদের নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সেই বিপদকে, যেটি এখনও দেখা যায়নি।