ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দেশে আগস্টে সড়কে ৪৮১ মৃত্যু, এক-তৃতীয়াংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়

দেশে আগস্টে সড়কে ৪৮১ মৃত্যু, এক-তৃতীয়াংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১২ সেপ্টেম্বর:

আগস্টে দেশের সড়কগুলো যেন মৃত্যুর মিছিল দেখেছে। এক মাসে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮১ জন, আহত হয়েছেন আরও ৬৬৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ শিশু।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মোট প্রাণহানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। আগস্টে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন। অর্থাৎ মাসটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের আগস্টের পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থাটির নিজস্ব সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

সড়কে প্রাণ হারানো মানুষের বড় একটি অংশ পথচারীও। আগস্টে ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৭ জন।

যানবাহনভিত্তিক হিসাবে মোটরসাইকেল সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থানে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী মিলিয়ে নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন। থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৮ জনের। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপসহ ভারী যানবাহনে নিহত হয়েছেন ৫১ জন। বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ৩৭ জন।

এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন যানবাহনের ২১ যাত্রী, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও জিপের ১১ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে। আগস্টে আঞ্চলিক সড়কে সবচেয়ে বেশি ২১৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় মহাসড়কে ১৬৩টি, গ্রামীণ সড়কে ৬২টি এবং শহরের সড়কে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার ধরনেও বেপরোয়া গতি ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি স্পষ্ট। ১৯৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৬টি। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ছিল ১০৬টি এবং পেছন থেকে অন্য যানবাহনে ধাক্কার ঘটনা ৭৮টি।

বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে—১৭২টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৪ জন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে, ১৫টি; সেখানে নিহত হয়েছেন ১৪ জন।

জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বগুড়ায়। আগস্টে সেখানে ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

আগস্টের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে আগের মাসের সঙ্গে তুলনা করলে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, জুলাইয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩ দশমিক ৪১ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। আগস্টে দৈনিক গড় মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫১ জনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক গড় প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার পেছনে উঠে এসেছে একাধিক কারণ। অতিরিক্ত গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, চালকদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো—সবই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাফিক আইন না জানা বা না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির মতো কাঠামোগত সমস্যা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নিরাপদ সড়কের জন্য জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। যানবাহনে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ারও সুপারিশ করেছে তারা।

রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে আধুনিক বাসসেবা চালু, বিআরটিসির সক্ষমতা ও বাসসংখ্যা বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি তাঁদের উপযুক্ত বেতন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও রয়েছে।

মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ, রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাজেট বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাটি এসেছে মোটরসাইকেল থেকে। দ্রুতগতির এই বাহনটি তরুণদের কাছে সহজ ও জনপ্রিয় হলেও নিরাপত্তাহীন চালনা, অতিরিক্ত গতি ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এটি এখন সড়ক মৃত্যুর অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, কেবল আইন করলেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ চালক, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণে পরিবর্তন। আর এসব বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।