বাংলাদেশ সংবাদ

দেশে শুধু একদিনেই খুন সহ অপমৃত্যু প্রায় দুই ডজনের বেশি

দেশে শুধু একদিনেই খুন সহ অপমৃত্যু প্রায় দুই ডজনের বেশি

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৫ সেপ্টেম্বর :

বাংলাদেশে মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর দিনভর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খুন, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত দুই ডজনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে দিনের আলোতেই। কোথাও সেলুনে চুল কাটতে বসা যুবককে গুলি ও চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও চোর সন্দেহে যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই দিনে সড়ক ও অন্যান্য দুর্ঘটনাতেও প্রাণ গেছে বহু মানুষের।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে ‘রাজ’ সেলুনে চুল কাটাতে গিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী ফরহাদ হোসেন। এ সময় কয়েকজন সেলুনে ঢুকে তাঁকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ফরহাদ মোহাম্মদপুর-রায়েরবাজার এলাকার ‘পাটালি গ্রুপের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বজনদের দাবি, চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হামলা হয়েছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালীর পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল নামে এক যুবককে আটক করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে এবং কাঁধে ইট রেখে মারধর করা হয়। পরে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।

বরিশাল নগরীর ইছাকাঠি কলোনিতে সোমবার গভীর রাতে আইনজীবীর সহকারী নুরুজ্জামান হাওলাদারকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার ভোরে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ একটি ভাড়া বাসার ভেতর থেকে তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে। তাঁর স্ত্রী নাছিমা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে এবং ঘটনার পর তিনি পলাতক।

মাগুরার শালিখায় পুরোনো একটি হত্যা মামলা প্রত্যাহারের চাপকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে সুলতান মোল্যা নামে ২৫ বছর বয়সী এক বাক্‌প্রতিবন্ধী যুবক নিহত হন। ঘটনায় আরও প্রায় ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের মহামায়া এলাকায় মঙ্গলবার বিকেলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও পিকআপের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সামনে থাকা প্রাইভেটকার হঠাৎ ব্রেক করলে পেছনের সিএনজি সেটিকে ধাক্কা দিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপের সামনে পড়ে।

রাজধানীর খিলক্ষেতের কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও রাত ৮টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে বংশীপুর এলাকার লস্কর ফিলিং স্টেশনের সামনে বিআরটিসি বাসের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী শুভঙ্কর মণ্ডল (৩০) নিহত হন। তিনি খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।

নওগাঁর মান্দায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঘরে চার্জে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্লাগ খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অটোরিকশাচালক সফিজ উদ্দিন মোল্লা (৪৫) মারা যান। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বগুড়ার নন্দীগ্রামে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির টিনের চালে বিদ্যুতের তার মেরামতের জন্য ওঠেন তোরাব আলী (২৭)। বিদ্যুতায়িত টিনের সংস্পর্শে এসে তিনি ছিটকে মাটিতে পড়ে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

নেত্রকোনার মদনে মঙ্গলবার দুপুরে নির্মাণাধীন মদন আদর্শ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ দেখতে গিয়ে বিদ্যুতের সংস্পর্শে মারুফ মিয়া (২৩) মারা যান। তাঁকে মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুকুরিয়া ইউনিয়নের তেঁতছিপাড়া এলাকায় মঙ্গলবার সকালে বাড়ির কাজ করার সময় বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে আজিজুল হক (৪৫) ও ফরহাদ জমির (৩৮) আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আজিজুল হকের মৃত্যু হয়; ফরহাদ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ময়মনসিংহেও মঙ্গলবার সড়ক দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর খবর এসেছে। ময়মনসিংহে বালুবাহী ডাম্পট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দিনের শিরোনামে এসেছে।

এর বাইরে মুক্তাগাছায় এক যুবককে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও মৃত্যুর খবর ১৫ সেপ্টেম্বরের সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসেছে।

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ১৫ সেপ্টেম্বর ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ সংখ্যা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ময়মনসিংহের বিভাগীয় প্রশাসনের বক্তব্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। তাই যাচাই ছাড়া ছয়জনকে ১৫ সেপ্টেম্বরের নিশ্চিত মৃত্যুর হিসাবে যোগ করা হচ্ছে না।

আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা–১১টার দিকে বেমালিয়া নদীতে স্পিডবোট ও বাল্কহেডের সংঘর্ষে দয়াল মিয়া ও সজীব মিয়া নামে দুজন নিহত হন। ঘটনাটি ১৪ সেপ্টেম্বরের হলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর।

এক দিনের ঘটনাগুলো একত্র করলে দেখা যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় খুন, গণপিটুনি, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত দুই ডজনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে এটি কোনো সরকারি জাতীয় মৃত্যুর হিসাব নয়; বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পৃথক ঘটনার সমন্বিত হিসাব। একই ঘটনা একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় এখানে একবারই গণনা করা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মৃত্যুর ধরনগুলোও বিচিত্র—কেউ সেলুনে বসে চুল কাটতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন, কেউ চোর সন্দেহে জনতার হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ বিদ্যুতের তারে স্পর্শ করে, আবার কেউ সড়ক বা রেলপথের দুর্ঘটনায়। অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বরের মৃত্যুগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো দেশের জননিরাপত্তা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, সড়ক নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনের ঝুঁকি—সবকিছুরই কঠিন বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।