ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
তীব্র গরমে লন্ডনে বাসচালকদের ধর্মঘট
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৬ আগস্ট:
তীব্র গরমে অসহনীয় কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে লন্ডনে ধর্মঘটে নেমেছেন ১ হাজার ৫০০-এর বেশি বাসচালক। অ্যারাইভা নর্থ লন্ডনের আটটি গ্যারেজের ইউনাইটেড ইউনিয়নের সদস্যরা এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, গরমের সময় বাসের চালকের কেবিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উঠে যাচ্ছে, অথচ পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।
চালকদের ধর্মঘট ১৪ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে এবং অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। মোট ২৬ দিন, ১১ দফায় এই ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম দফার কর্মসূচি ছিল ১৪ ও ১৫ আগস্ট। পরবর্তী কর্মসূচিগুলো হলো—
- ১৪–১৫ আগস্ট
- ১৮–২১ আগস্ট
- ২৫–২৮ আগস্ট
- ৪–৫ সেপ্টেম্বর
- ৭–৮ সেপ্টেম্বর
- ১৮–১৯ সেপ্টেম্বর
- ২১–২২ সেপ্টেম্বর
- ২–৩ অক্টোবর
- ৫–৬ অক্টোবর
- ১৬–১৭ অক্টোবর
- ১৯–২০ অক্টোবর
এই ধর্মঘটের প্রভাব পড়ছে উত্তর ও পূর্ব লন্ডন, মধ্য লন্ডনের কিছু অংশ এবং এসেক্সের বাসসেবায়। প্রায় ৪০টি বাস রুট এতে আক্রান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে লন্ডনের অধিকাংশ বাসসেবা স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
কেবিনে ৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপ
চালকদের অভিযোগ, তীব্র গরমে বাসের চালকের কেবিন অসহনীয় হয়ে ওঠে। কয়েকজন চালক কেবিনের তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ পুরোনো বাসে কার্যকর এয়ার কন্ডিশনিংয়ের বদলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এয়ার-কুলিং ব্যবস্থা রয়েছে, যা গরমের সময় তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি কমাতে পারে।
চালকদের কেউ কেউ অতিরিক্ত গরমে অসুস্থও হয়েছেন। ইউনিয়নের ভাষ্য অনুযায়ী, এ গ্রীষ্মে চালকদের মধ্যে হিট এক্সহস্টশন, হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত গরমে ক্লান্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়ায় বাস দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
চালকদের মূল দাবি এয়ার কন্ডিশনিং
চালকদের প্রধান দাবি, বাসের চালকের কেবিনে কার্যকর এয়ার কন্ডিশনিং নিশ্চিত করা। তাদের বক্তব্য, যাত্রীরা যেমন নিরাপদ ও সহনীয় পরিবেশে যাতায়াতের অধিকার রাখেন, চালকদেরও তেমন নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ইউনাইটেড ইউনিয়নের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে গরমের মধ্যে কাজের ঝুঁকি নিয়ে অ্যারাইভা নর্থ লন্ডন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে আসছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সমস্যার যথেষ্ট সমাধান হয়নি।
অন্যদিকে অ্যারাইভা জানিয়েছে, বাসের এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা উন্নত করার কাজ চলছে এবং নতুন বাসও যুক্ত করা হচ্ছে।
ব্রিটেনে গরমে কাজের নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নেই
লন্ডনের বাসচালকদের এই আন্দোলন ব্রিটেনে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরমের একটি বড় দুর্বলতাও সামনে এনেছে। কর্মক্ষেত্রে কত ডিগ্রি তাপমাত্রা হলে কাজ বন্ধ করতে হবে—এমন নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ তাপমাত্রার আইন নেই।
ফলে তীব্র তাপপ্রবাহের সময় একজন শ্রমিককে কতটা গরম পরিবেশে কাজ করতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট আইনি সীমা নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলো এ অবস্থার পরিবর্তন এবং কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার একটি বাধ্যতামূলক সীমা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে।
শুধু বাসচালকদের সমস্যা নয়
লন্ডনের বাসচালকদের ধর্মঘটকে তাই শুধু একটি পরিবহন খাতের শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ব্রিটেনে তাপপ্রবাহ বাড়ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নির্মাণশ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী, কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের ওপর।
একসময় ব্রিটেনে অতিরিক্ত গরমকে কর্মক্ষেত্রের বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাপপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নীতিও বদলানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
লন্ডনের বাসচালকদের ২৬ দিনের ধর্মঘট সেই পরিবর্তনের দাবিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। গরম এখন শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়; এটি শ্রমিকের নিরাপত্তা, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত একটি বাস্তব সমস্যা।