ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
চীনের হাতে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব তেলের ক্ষমতার মানচিত্র
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ১৬ আগস্ট:
বিশ্বের তেলবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল সৌদি আরব ও নেতৃত্বাধীন ওপেক। কিন্তু সেই সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু তেল উৎপাদন নয়—বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক, বিশাল পরিশোধন সক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় মজুত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের ওপর প্রভাবের কারণে চীন নিজেই হয়ে উঠছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘তেল শক্তি’।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের মূল বক্তব্যও এ পরিবর্তনকে ঘিরে। সাময়িকীটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেলের বাজারে শুধু ওপেকের উৎপাদন সিদ্ধান্ত দেখলেই এখন আর বিশ্ববাজারের গতিপথ বোঝা যাবে না; চীনের সিদ্ধান্তও ক্রমেই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীনের বিশেষত্ব হলো—দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক নয়, বরং বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করেও বাজারে অসাধারণ প্রভাব তৈরি করেছে। ২০১৩ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারকে পরিণত হয়। একই সঙ্গে দেশটি নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও পরিশোধনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
ওপেকের বাইরে চীনের নতুন ক্ষমতা
ওপেকের শক্তি মূলত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে। সদস্য দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে। চীনের ক্ষমতার ধরন কিছুটা ভিন্ন।
বেইজিং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তেল কিনে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, ইরানসহ একাধিক উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো বিদেশি তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, পাইপলাইন ও বন্দর অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে। ফলে তেলের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব শুধু ‘কত ব্যারেল উৎপাদন করছে’—এই হিসাব দিয়ে মাপা যায় না।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এখন বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে কৌশলগত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তেলের বিনিময়ে অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক তৈরি করছে বেইজিং।
বিশাল পরিশোধন সক্ষমতা
চীনের আরেকটি বড় শক্তি হলো পরিশোধন শিল্প। বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা ডিজেল, গ্যাসোলিন, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যে রূপান্তর করার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
এ কারণে চীন চাইলে শুধু অপরিশোধিত তেলের ক্রেতা হিসেবে নয়, পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহকারী হিসেবেও আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।
আর এখানেই ওপেকের সঙ্গে চীনের মৌলিক পার্থক্য। ওপেক মূলত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে; চীন একই সঙ্গে আমদানি, মজুত, পরিশোধন, পরিবহন ও চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারের বিশাল একটি চেইনের ওপর প্রভাব রাখে।
তেলের চাহিদা কমলেও প্রভাব কমছে না
চীনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে পরিবহন খাতে। বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার এবং পরিবহন ব্যবস্থার বিদ্যুতায়নের কারণে দেশটির পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে চীনের তেল-ক্ষমতা দ্রুত কমে যাবে। বরং চীনের হাতে এখন বিপুল অবকাঠামো, মজুত এবং ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে। ফলে তেলের চাহিদা কমার সময়েও কখন, কোথা থেকে এবং কত তেল কিনবে—সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা একসময় দেশটির দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতো। এখন বেইজিং সেই নির্ভরতাকেই কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সমুদ্রপথের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে চীন দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথ বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে চীন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইভাবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের তেল রপ্তানির বড় বাজার চীন। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে যে তেল অন্য বাজারে সীমিত হয়ে পড়েছে, তার একটি বড় অংশের শেষ গন্তব্য হয়ে উঠেছে চীন।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতেও এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের জুলাই ২০২৬-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও চীনের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তেহরানকে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেছে।
অর্থাৎ চীন শুধু তেল কিনছে না; বিশ্বের কোন তেল বাজারে যাবে, কোন দেশ ক্রেতা পাবে এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা কার্যকর হবে—এসব ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা বাড়ছে।
‘তেলের রাজা’ হওয়ার অর্থ বদলে যাচ্ছে
একসময় তেলশক্তি বলতে বোঝানো হতো সৌদি আরব, রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎপাদক দেশকে। কিন্তু চীনের উত্থান সেই সংজ্ঞাকে বদলে দিচ্ছে।
চীনের হাতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পভিত্তি, বিপুল তেল আমদানির ক্ষমতা, বিশাল পরিশোধন অবকাঠামো, কৌশলগত মজুত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত জ্বালানি কোম্পানি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক।
ফলে ভবিষ্যতের তেলবাজারে প্রশ্নটি হয়তো আর শুধু হবে না—ওপেক কত ব্যারেল তেল উৎপাদন করবে?
বরং প্রশ্ন হতে পারে—চীন কত তেল কিনবে, কতটা মজুত করবে, কতটা পরিশোধন করবে এবং কখন বাজারে ছাড়বে?
এ কারণেই দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণকে শুধু চীনের জ্বালানি নীতি নিয়ে আলোচনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর গভীরে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। তেলের যুগ শেষ হওয়ার আগেই হয়তো তেলের ক্ষমতার পুরনো রাজত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে—আর সেই নতুন সমীকরণে বেইজিংয়ের ভূমিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে।