ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বিদ্যুৎ-গ্যাস ঠিক হতে দুই বছর, ততদিনে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্নে বাতি জ্বলবে তো?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৭ আগস্ট:
দেশের অর্থনীতির সামনে লক্ষ্য এক ট্রিলিয়ন ডলার, সময়সীমা ২০৩৪ সাল। কিন্তু সেই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি—বিদ্যুৎ ও গ্যাস—ঠিক করতেই নাকি আরও অন্তত দুই বছর লাগতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতিকে দৌড়াতে বলা হচ্ছে, অথচ তার পায়ে এখনো বিদ্যুৎ-গ্যাসের ঘাটতির শিকল!
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে সেখানে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরে সমাধান করা সম্ভব নয়; বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানেই ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে।
খবরটি শুনে সাধারণ মানুষের হয়তো একটি প্রশ্নই জাগতে পারে—বিদ্যুৎ-গ্যাস যদি দুই বছর পর ঠিক হয়, তাহলে এর মধ্যে অর্থনীতি চলবে কী দিয়ে? স্বপ্নের জ্বালানি দিয়ে?
সরকার অবশ্য আশাবাদী। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো, জ্বালানি মিশ্রণ, এলএনজি টার্মিনাল ও স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ নিয়ে কাজ চলছে। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল—শুধু বর্তমানের বাতিটা মাঝেমধ্যে নিভে যাচ্ছে!
একদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট কাটাতে দুই বছর সময় চাওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর কথাও জোরেশোরে বলা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আবার দীর্ঘদিনের লালফিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দ্রুত সংস্কার চাচ্ছেন।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণে টাস্কফোর্স হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী বা নাগরিক সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আটকে গেলে ওয়েবসাইটে অভিযোগ করতে পারবেন এবং সরকার বিষয়গুলো প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করবে।
শুনতে বেশ চমৎকার। এখন শুধু প্রশ্ন—ওয়েবসাইটে অভিযোগ করার পর যদি সেই অভিযোগও লালফিতায় আটকে যায়, তখন অভিযোগ করবে কে?
এর মধ্যেই করব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেশন করার পরিকল্পনার কথাও এসেছে। রিটার্ন জমা থেকে শুরু করে করসংক্রান্ত সেবা অনলাইনে দেওয়া গেলে হয়রানি ও অনিয়ম কমবে—এমন প্রত্যাশা সরকারের।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন অ্যামচেম বলছে, সংস্কারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়নই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। অর্থাৎ বক্তৃতায় সংস্কার হয়ে গেলেও বাস্তবে তার ‘ডেলিভারি’ চাই।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক আশাবাদের গল্প। দেশের মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। তরুণদের জন্য অব্যবহৃত পুকুর, বিল ও জলাশয় কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের অর্থনীতির হিসাবটা একটু ভিন্ন। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, নিত্যপণ্যের চাপ আর বাজারের অস্থিরতার মধ্যে সোনার দামও যেন অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। চলতি বছরেই সোনার দাম ১০৪ বার সমন্বয় হয়েছে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এখন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭৯ টাকা।
অর্থাৎ অর্থনীতি হয়তো ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে যাবে—কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেটের অর্থনীতি এর মধ্যেই ‘ট্রিলিয়ন’ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে!
সব মিলিয়ে পরিকল্পনার অভাব নেই। ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য আছে, সবুজ প্রযুক্তির পরিকল্পনা আছে, কর অটোমেশনের পরিকল্পনা আছে, বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যার জন্য একটু ধৈর্য ধরতে হবে—মাত্র দুই বছর!
ততদিনে অর্থনীতির চাকা থেমে থাকবে না নিশ্চয়ই। প্রশ্ন হলো, চাকা ঘোরানোর জন্য বিদ্যুৎ-গ্যাস থাকবে তো?
কারণ অর্থনীতির স্বপ্ন যত বড়ই হোক, কারখানার মেশিন কিন্তু বক্তৃতায় চলে না—চলে বিদ্যুৎ আর গ্যাসে।