ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ঢাকায় উদ্ধার অভিযানই হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১৭ আগস্ট:
রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে শুধু ভবনধস বা প্রাণহানিই নয়, উদ্ধার অভিযান পরিচালনাও বড় সংকটে পড়তে পারে। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু সড়ক ও ভয়াবহ যানজটের কারণে অনেক এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর ঢাকার বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও ভবনের ধ্বংসস্তূপ, কোথাও গ্যাসলাইন থেকে আগুন, আবার কোথাও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হতে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে ফায়ার সার্ভিস। ঢাকার ৪১টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ছড়িয়ে রাখা হয়েছে, যাতে বড় দুর্যোগের পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারলেও কাছাকাছি মজুত থাকা সরঞ্জাম দিয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায়।
ঢাকায় আসবে দেশের ১০০ বিশেষ ইউনিট
সম্ভাব্য ভয়াবহ ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশের প্রায় ১০০টি বিশেষ ফায়ার স্টেশনকে আগাম চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। রাজধানীতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে এসব স্টেশনের ইউনিট ঢাকায় এনে উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরির কাজ চলছে। গত বছর রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় ৪০০ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও করা হচ্ছে।
তিন দিনের প্রশিক্ষণে এসব স্বেচ্ছাসেবককে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ, ঝুঁকি এড়ানো এবং দুর্যোগস্থলে দ্রুত সহায়তার কৌশল শেখানো হচ্ছে।
৫৩৮ স্টেশনের বিপরীতে প্রয়োজন ১,৭০০
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশন চালু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য একটি ফায়ার স্টেশন থাকা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে দেশে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষের জন্য একটি স্টেশন রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে দেশের ঝুঁকি ও জনসংখ্যা বিবেচনায় অন্তত ১,৭০০টি স্টেশন প্রয়োজন। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে স্টেশনের সংখ্যা ৯৯৭টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ১২টি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
ঢাকার ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। তীব্র যানজটে ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো ফায়ার সার্ভিসের এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। ফলে বড় ভূমিকম্পের পর সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একই সঙ্গে ছুটবে একাধিক ইউনিট
জরুরি সাড়া দেওয়ার সময় কমাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত এলাকায় বড় দুর্ঘটনায় একটির বদলে একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি ফায়ার ইউনিট পাঠানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। একটি ইউনিট যানজটে আটকে গেলেও অন্য ইউনিট বিকল্প পথে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া চালু করা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের টোল-ফ্রি জরুরি নম্বর ১০২। যেকোনো সাধারণ ফোন থেকে বিনা মূল্যে এই নম্বরে যোগাযোগ করে দুর্ঘটনার খবর দেওয়া যাবে।
হেলিকপ্টার, ড্রোন ও রোবটের পরিকল্পনা
ভবিষ্যতের উদ্ধার ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষ শনাক্ত করতে বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তি ও সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিল্পকারখানার ভয়াবহ আগুন মোকাবিলায় রোবটিক ফায়ার ফাইটিং ভেহিক্যাল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও সুন্দরবনে দ্রুত আগুন নেভাতে ড্রোন, আর দ্রুত উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণের জন্য রেসকিউ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি সেনা ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় হেলিকপ্টারে ছোট উদ্ধার সরঞ্জামসহ ফায়ার ফাইটারদের দ্রুত দুর্গত এলাকায় নামানোর সমন্বিত প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
শুধু ফায়ার সার্ভিস দিয়ে এই দুর্যোগ সামলানো সম্ভব নয়
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক স্পষ্ট করেছেন, বড় ভূমিকম্প মোকাবিলা কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।
ঢাকার মেগা প্রকল্পগুলোর বড় ক্রেন, ডোজার ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনের সময় সেগুলো ব্যবহারের জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণের কাজও চলছে। এসব যন্ত্র ধ্বংসস্তূপ সরানো ও আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আগুনও হতে পারে ভূমিকম্পের দ্বিতীয় বিপদ
শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ভবন ধসের পাশাপাশি গ্যাসলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার পরিকল্পনায় অগ্নিনির্বাপণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য রাজধানীতে বিশেষ উদ্ধারকারী দল গঠন করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে স্পেশাল রেসকিউ টিম রয়েছে। ঢাকার পূর্বাচলে সদর অধিদপ্তরের অধীনে ৫০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাহিনীটি ২৭ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডে সাড়া দিয়েছে—অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৫টি আগুনের ঘটনা।
কর্তৃপক্ষের মতে, ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি আইন মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা এবং বাসিন্দাদের নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিসের চলমান সংস্কারের অংশ হিসেবে ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও এনওসি অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। কিউআর কোডযুক্ত লাইসেন্স ও কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ চালুর ফলে ভুয়া লাইসেন্স এবং অনিয়ম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব প্রস্তুতির পরও মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে যদি সত্যিই ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় পর্যায়ে মানুষ কতটা প্রস্তুত থাকবে?
কারণ দুর্যোগের প্রথম কয়েক মিনিটে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের সক্ষমতাই অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।