ডারউইনে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়; উল্লাসের বদলে বাংলাদেশ দেখাল সংযম ও আত্মবিশ্বাস

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের রূপকথা, বিস্ময়ে ব্রেন্ডন জুলিয়ান

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের রূপকথা, বিস্ময়ে ব্রেন্ডন জুলিয়ান

খেলাধূলা ডেস্ক, ১৭ আগস্ট :

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে প্রথম টেস্টে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে শুধু একটি ম্যাচই জেতেনি বাংলাদেশ, নিজেদের টেস্ট ক্রিকেটের বিবর্তনেরও যেন নতুন অধ্যায় খুলেছে।

তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সংযত উদযাপনই বিস্মিত করেছে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অলরাউন্ডার ব্রেন্ডন জুলিয়ানকে। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, মমিনুল হকের স্কয়ার কাটে জয়সূচক রান আসার সঙ্গে সঙ্গে ড্রেসিংরুম থেকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ছুটে এসে মাঠে উল্লাসে মেতে উঠবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য—বড় জয়, অথচ উদযাপনে অসাধারণ সংযম।

এই সংযমের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার গল্প।

একসময় বাংলাদেশের টেস্ট জয় ছিল বিরল ঘটনা। বিদেশের মাটিতে জয় তো আরও কঠিন। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলেছে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জয়, পাকিস্তানকে ধবলধোলাই, ওয়েস্ট ইন্ডিজে জয়—একটির পর একটি সাফল্য বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এবার সেই ধারাই পৌঁছাল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।

ডারউইনের জয় তাই শুধু আরেকটি টেস্ট জয় নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের বড় পরীক্ষা ছিল। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষে এটিকে বাংলাদেশের সব সংস্করণ মিলিয়ে ইতিহাসের সেরা জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ম্যাচের ফলও সেই দাবির পক্ষে কথা বলে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামে মাত্র ১৯৮ রানে। বাংলাদেশের জবাব ৪২৬। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রান তুললেও বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭। শুরুতেই তানজিদ হাসান তামিমের উইকেট কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করেছিল। কিন্তু সাদমান ইসলাম ও মমিনুল হক আর কোনো বিপদ হতে দেননি। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটিতে চার দিনের মধ্যেই ইতিহাসের দরজা খুলে যায়।

বাংলাদেশের জয়ের ভিত অবশ্য তৈরি হয়েছিল প্রথম দিন থেকেই। প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও দলের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরতে দেননি শান্ত। বরং টেস্ট শুরুর আগে তিনি দলকে বিশ্বাস রাখার বার্তা দিয়েছিলেন।

মাঠেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশের বোলাররা শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখেন। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম ইনিংসে বিপর্যস্ত হয় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন ক্যামেরন গ্রিন। তিনি করেন ১০৪ রান।

কিন্তু গ্রিনের সেঞ্চুরিও অস্ট্রেলিয়াকে রক্ষা করতে পারেনি।

মেহেদী হাসান মিরাজ তখন বাংলাদেশের জয়ের পথে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অ্যালেক্স ক্যারি, বাও ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও ভেঙে দেন তিনি। গ্রিনকে ফেরান হাসান মাহমুদ। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে থামে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস।

এই ম্যাচে হাসান মাহমুদের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরো ম্যাচে তাঁর শিকার ৯ উইকেট। আর মিরাজের স্পিন চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে কার্যত অচল করে দেয়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জয়টি এসেছে এমন এক দলের বিপক্ষে যারা নিজেদের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরেই শক্তির প্রতীক। বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারানো ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই এবার বাস্তব।

আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সম্ভবত মমিনুলের ব্যাটে।

২০১৯ সালে অধিনায়ক হওয়ার পর টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির যে ভিত গড়ার চেষ্টা করেছিলেন মমিনুল, ডারউইনে তাঁর ব্যাট থেকেই এসেছে জয়সূচক রান। যেন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। তাঁর শুরু করা দীর্ঘ যাত্রা এখন নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ ৯টি টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে। অর্থাৎ এই জয় কেবল একটি দিনের সাফল্য নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়ার ফল।

ডারউইনের এই জয় আরও একটি বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশ এখন শুধু টেস্ট ম্যাচ জিততে চায় না, জয়ের বিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামে।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশিয়ার কোনো দলের এমন সাফল্যও দীর্ঘ বিরতির পর এল। আর বাংলাদেশের জন্য এটি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট জয় হলেও প্রথমবার তাদের মাটিতে জয়। সেই কারণে ডারউইনের এই ৯ উইকেটের জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

জয়ের পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সংযত উদযাপন তাই হয়তো নিছক উদযাপনের ধরন নয়। এটি আত্মবিশ্বাসেরও প্রকাশ।

একসময় বাংলাদেশ বড় দলের বিপক্ষে জিতলে সেটি ছিল বিস্ময়। এখন বাংলাদেশ বড় দলকে হারানোর পরও যেন জানে—এটি অসম্ভব কিছু নয়।

ব্রেন্ডন জুলিয়ানের বিস্ময়ের জায়গাটিও সম্ভবত সেখানেই।

বাংলাদেশ যে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে, সেটি বিস্ময়ের বিষয় হতে পারে। কিন্তু আরও বড় পরিবর্তন হলো—বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে সেই জয় এখন আর অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না।

ডারউইনে তাই শুধু অস্ট্রেলিয়া হারেনি; হারিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে পুরোনো ধারণাটিও।

এটি একটি টেস্ট জয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের কাছে—একটি যুগ বদলের ঘোষণা।