রমজান: আত্মশুদ্ধির ডাক, নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রত্যয়

রমজান: আত্মশুদ্ধির ডাক, নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রত্যয়

বিশেষ সম্পাদকীয়

১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান। সংযম, রহমত ও মুক্তির এ মাসে ভয়েস অব পিপল–এর পক্ষ থেকে সকল পাঠককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা—রমজান মোবারক।

রমজান কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটি আত্মার বিপ্লবের সময়। যে মাসে মানুষ ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে, যেন দরিদ্রের হাহাকার বুঝতে শেখে। যে মাসে রোজা মানুষকে শেখায়—সংযম মানেই দুর্বলতা নয়, বরং চরিত্রের শক্তি।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের চাপে মানুষ বিপর্যস্ত, তখন রমজান আমাদের সামনে তোলে এক মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটছি, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ?

আত্মসমালোচনার আয়না

রমজান আত্মসমালোচনার আয়না। সারা বছরের অবহেলা, অন্যায়, প্রতারণা, হিংসা ও অনিয়ম থেকে ফিরে আসার সুযোগ। একজন মুমিন শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকেন না; তিনি মিথ্যা থেকে, অন্যায় লভ্যাংশ থেকে, দুর্নীতি থেকে, কুৎসা ও বিদ্বেষ থেকে নিজেকে সংযত রাখেন।

যদি রোজা আমাদের আচরণ না বদলায়, যদি আমাদের ভাষা ও লেনদেনে সততা না আসে—তবে সেই রোজা কেবল ক্ষুধা-পিপাসার অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

বাজার ও মানবিকতার পরীক্ষা

রমজান রহমতের মাস, কিন্তু এ মাসে যদি দ্রব্যমূল্য বাড়ে, যদি অতিমুনাফার প্রতিযোগিতা শুরু হয়—তবে তা রমজানের চেতনাকে আঘাত করে। সংযমের মাসকে ভোগের মৌসুমে পরিণত করা আত্মিক শিক্ষার পরিপন্থী।

ব্যবসা হালাল, লাভ বৈধ—কিন্তু অন্যের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফা অর্জন ইসলামের শিক্ষা নয়। রমজান আমাদের শেখায়—মানুষের জন্য সহজ করা ইবাদতেরই অংশ।

ইবাদতের আলো ও লাইলাতুল কদর

রমজানের রাতগুলো আলোকিত হয় তারাবি, তাহাজ্জুদ ও কোরআন তেলাওয়াতে। বিশেষ করে শেষ দশকে আসে লাইলাতুল কদর—হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এক মহিমান্বিত রাত। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সৎ সিদ্ধান্ত, একটি খাঁটি তওবা, একটি আন্তরিক দোয়া মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

দোয়া ও দায়বদ্ধতার মাস

রমজান দোয়া কবুলের মাস। ইফতারের মুহূর্তে একটি আন্তরিক দোয়া আসমানে পৌঁছে যায়—এ বিশ্বাস মুসলমানের শক্তি। কিন্তু দোয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন দায়বদ্ধতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব জায়গায় ন্যায়, সততা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও রমজানের অংশ হওয়া উচিত।

রমজান আমাদের শেখায়—নিজেকে বদলাও, সমাজ বদলাবে। আত্মশুদ্ধি ছাড়া সংস্কার আসে না; সংযম ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না; নৈতিকতা ছাড়া সমৃদ্ধি অর্থহীন।

আসুন, আমরা রমজানকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, চেতনায় গ্রহণ করি। নিজেদের ভেতরকার অহংকার, লোভ ও অন্যায়কে পরাস্ত করি। রোজার শিক্ষা যেন আমাদের ব্যক্তিজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন ও রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়।

এই পবিত্র মাস আমাদের জন্য হোক নৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা।
মহান আল্লাহ আমাদের রোজা, নামাজ ও দোয়া কবুল করুন।

রমজান মোবারক।