ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন সমীকরণ

শেখ হাসিনাকে ফেরানোর সিদ্ধান্তে আদালতের ভূমিকা, দিল্লি-ঢাকার আলোচনাও চলছে

শেখ হাসিনাকে ফেরানোর সিদ্ধান্তে আদালতের ভূমিকা, দিল্লি-ঢাকার আলোচনাও চলছে

ভারত প্রতিনিধি, ১৬ আগস্ট:  সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ নিয়ে ভারত সরকার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না; ভারতের বিদ্যমান আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টি এগোতে হবে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি সূত্র।

ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ১৬ আগস্টের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর যে অনুরোধ করেছে, সেটি নিয়ে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রত্যর্পণের বিষয়ে বর্তমান অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য পথও খোঁজা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত সরাসরি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে নেওয়ার বিষয় নয়। ভারতীয় আইনের আওতায় অভিযোগগুলোর প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত পরীক্ষা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।

দ্বৈত অপরাধের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ

শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো dual criminality বা দ্বৈত অপরাধের নীতি। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে অপরাধের অভিযোগে তাকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে, সেই অপরাধ ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা পরীক্ষা করা হতে পারে।

ভারত ও বাংলাদেশ ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি সই করে। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়, যাতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা যায়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পূর্ববর্তী আইনি বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, চুক্তির আওতায় অপরাধটি দুই দেশেই দণ্ডনীয় হওয়া গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রাখা হলেও হত্যা, হত্যাকাণ্ড, হামলা, অপহরণ, জিম্মি করা এবং সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার বিধান রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ধরন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আদালতের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকাও থাকবে

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর তা পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে একজন অনুসন্ধানী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যেতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি যথেষ্ট মনে করলে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন। আবার প্রাথমিক মামলা প্রতিষ্ঠিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেটের সুপারিশের পরও বিষয়টি সরাসরি শেষ হয়ে যায় না। ভারতের সরকারি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিবেচনা করে প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেটের সুপারিশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আদালতীয় পরীক্ষা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত—দুই স্তরের আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত

ঢাকার অনুরোধের সঙ্গে নথিপত্রও দিয়েছে বাংলাদেশ

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ যে অনুরোধ করেছে, তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রও দেওয়া হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, অনুরোধটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন। এদিকে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে।

হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা

সম্প্রতি ভারত থেকে অনলাইনে দেওয়া এক বক্তব্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি বছরের শেষ দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। তার বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তার সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ফলে এখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি কূটনৈতিক ইস্যু নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের প্রত্যর্পণ আইন, দুই দেশের চুক্তির শর্ত, অভিযোগের আইনি প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য বিচারিক পর্যালোচনা।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না—তার উত্তর এখনই নিশ্চিত নয়। তবে বিষয়টি ভারতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে এবং একই সঙ্গে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টাও চলছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস; ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা।