নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১৯।। স্বপ্ন দেখা অপরাধ যেখানে
গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি মাটির ঘর ছিল। ঘরের সামনে একটা শিউলি গাছ। ভোর হলে সাদা ফুল ঝরে পড়ত উঠোনে। সেই ফুল কুড়িয়ে মা ঠাকুরঘরে দিতেন, আর ছেলে অয়ন বসে বসে সেই দৃশ্য দেখত।
অয়ন ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিল। বন্ধুরা যখন মাঠে ফুটবল খেলত, সে তখন গাছের পাতার শব্দ শুনত। বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে কবিতা লিখত। পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি দেখে তার মনে হতো—এই পৃথিবী শুধু খাওয়া-পরা আর বেঁচে থাকার জন্য নয়, এর ভেতরে আরও গভীর কোনো সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

কিন্তু অয়নের এই স্বপ্নকে সবাই ভালো চোখে দেখত না।
পাড়ার মানুষ বলত,
“কবিতা লিখে পেট চলবে?”
“শিল্পী হয়ে কী হবে? চাকরি করো, টাকা কামাও।”
“এসব করে জীবন নষ্ট করছ।”
অয়ন চুপ করে শুনত। কারণ সে জানত, শিল্পীর পথ কখনো সহজ ছিল না। যে মানুষ গান লেখে, ছবি আঁকে, কবিতা লিখে কিংবা নাটকের মঞ্চে দাঁড়ায়—সে আসলে নিজের জন্য নয়, মানুষের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া আলোটুকু জ্বালিয়ে রাখার জন্য বাঁচে।
একদিন অয়নের বাবা বলেছিলেন,
“বাবা, আমাদের দেশে শিল্পী হওয়া অনেকটা নদীর উজানে নৌকা চালানোর মতো। সবাই ভাটির দিকে যায়, তুমি উল্টো দিকে যাচ্ছ।”
অয়ন হেসে বলেছিল,
“বাবা, সবাই যদি ভাটির দিকে যায়, তাহলে উজানের সৌন্দর্য দেখবে কে?”
বাবা উত্তর দেননি। শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখেছিলেন।
সময় বদলাল। অয়ন বড় হলো। শহরে গেল। গান শিখল, সাহিত্য পড়ল, নাটকের সঙ্গে যুক্ত হলো। সে দেখল—এই দেশে একসময় মানুষ দরিদ্র ছিল, কিন্তু হৃদয় দরিদ্র ছিল না।
নুন-ভাত খেয়েও মানুষ গান গাইত। কষ্টের সংসারেও সন্ধ্যায় উঠোনে বসে গল্প হতো। পাড়ায় নাটক হতো, কবিতা আবৃত্তি হতো, মানুষ একে অন্যের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত।
কারণ তখন মানুষের জীবনে রাজনীতি ছিল, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে ছিল সংস্কৃতির মেলবন্ধন। মানুষ মতের ভিন্নতা মানত, কিন্তু মানুষকে শত্রু ভাবত না।
কিন্তু ধীরে ধীরে সব বদলে গেল।
রাজনীতি যখন মানুষের কল্যাণের পথ থেকে সরে ক্ষমতার একলা যাত্রায় পরিণত হলো, তখন তার সঙ্গে ঢুকে পড়ল ক্রোধ, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা আর বিভেদের ভাষা।
অয়ন দেখল—মানুষ গান শুনে চোখের জল ফেলছে না, বরং গায়ক কোন পক্ষের তা খুঁজছে। কবিতার সৌন্দর্য নয়, কবির পরিচয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শিল্পের মূল্য নয়, শিল্পীর মতামত নিয়ে বিচার হচ্ছে।
একদিন এক তরুণ অয়নকে বলল,
“আপনারা শিল্পীরা শুধু আবেগ নিয়ে থাকেন। বাস্তবতা বোঝেন না।”
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“যে মানুষ আবেগ হারায়, সে বাস্তবতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে। কারণ আবেগ না থাকলে মানুষ শুধু হিসাব জানে, মানবতা জানে না।”
অয়ন তাকে বোঝাতে চেয়েছিল—যে মানুষ লিখেছিল,
“কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”
সে শুধু কবিতা লেখেনি, মানুষের ভেতরের বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল।
যে কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে,
“মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা আমি নয়ন জলে ভাসি”
সে শুধু একটি গান সৃষ্টি করেনি, মানুষকে দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
জাতীয় সঙ্গীতের প্রতিটি শব্দে যে আবেগ, যে ভালোবাসা—তা কোনো ক্ষমতার কাগজে লেখা যায় না। তা জন্ম নেয় একজন সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়ে।
কিন্তু কিছু মানুষ তা বোঝে না।
তারা ভাবে, শিল্পী মানেই অপ্রয়োজনীয় মানুষ। যেন শিল্পী সমাজের বাড়তি বোঝা।
তারা ভুলে যায়—যে জাতির কবিতা নেই, গান নেই, নাটক নেই, ছবি নেই—সে জাতি শুধু বেঁচে থাকে, কিন্তু জীবন উদযাপন করতে শেখে না।
বছরের পর বছর কেটে গেল। অয়ন এখন পরিচিত শিল্পী। তার গান মানুষ গায়, তার লেখা মানুষ পড়ে।
কিন্তু একদিন এক বৃদ্ধ তাকে বললেন,
“তোমরা শিল্পীরা বড় অদ্ভুত মানুষ। নিজের সুখের কথা না ভেবে মানুষের হৃদয়ের কথা ভাবো।”
অয়ন বলল,
“দাদু, এটাই তো শিল্পীর কাজ।”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কিন্তু এই কাজের মূল্য সবাই বুঝবে না।”
অয়ন জানত, সত্যি কথা।
কারণ পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে যারা চোখ খোলা রেখেও অন্ধ। তাদের সামনে হাতি দাঁড় করালেও তারা শুধু নিজের ধারণাটুকুই দেখতে পায়।
যাকে দেখতে পারে না, তার চলন বাঁকা—এই পুরনো অভ্যাসে তারা শিল্পী, চিন্তক আর সৃজনশীল মানুষদের দোষ খোঁজে।
তারা ভাবে, একজন শিল্পীর ছোট ভুল ধরতে পারলেই জয় হয়ে গেল।
কিন্তু তারা দেখতে পায় না—পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় অন্যায়গুলো ধীরে ধীরে সমাজের ভিত নষ্ট করে দিচ্ছে।
একটি খড় সরাতে গেলে যারা রেগে আগুন হয়, তারা অনেক সময় টেরই পায় না—পুরো খড়ের গাদা কখন যেন কেউ নিয়ে গেছে।
অনেক বছর পর অয়ন আবার নিজের গ্রামের সেই শিউলি গাছের নিচে ফিরে এল।
গাছটি এখনও আছে। ফুলও ঝরে পড়ে।
সে মাটিতে বসে একটি ফুল হাতে তুলে নিল।
মনে হলো, পৃথিবী এখনও সুন্দর।
কারণ যতদিন একজন মানুষও কবিতা লিখবে, গান গাইবে, ছবি আঁকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে—ততদিন মানুষের ভেতরের আলো নিভবে না।
শিল্পীরা হয়তো এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় “বোকা” মানুষ।
কারণ তারা লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে ভালোবাসতে শেখে।
আর এই পৃথিবী টিকে আছে সেইসব বোকা মানুষের কারণেই—যারা স্বপ্ন দেখে, সৌন্দর্যে বিশ্বাস করে এবং অন্ধকারের মাঝেও একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে।
লন্ডন, ১৯ জুলাই, ২০২৬