ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২০ ।। নরপিশাচ শিক্ষক

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২০ ।। নরপিশাচ শিক্ষক

।। নরপিশাচ শিক্ষক ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ
সেই সব প্রকৃত শিক্ষকদের,
যাদের স্নেহের আলোয় শিশুরা মানুষ হতে শেখে—

ঠাৎ মোবাইলের পর্দায় একটি ভিডিও ভেসে ওঠে। চায়ের দোকানে বসা মানুষগুলো প্রথমে ভাবে, হয়তো কোনো হাসির ভিডিও। কয়েক সেকেন্ড পর পুরো বাজার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

একটি ছোট্ট ছেলে কাঁদছে।

একজন শিক্ষক তার মুখে বারবার বেত ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।

পাশ থেকে আরেকটি শিশুর কণ্ঠ শোনা যায়, "হুজুর, আর মারবেন না..."

কিন্তু শিক্ষক হাসছেন।

ভিডিওর নিচে লেখা—

"পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে।"

... ...  ...

সেই ঘটনার কয়েক মাস আগে।

ফজরের আজান শেষ হয়।

সলিমুল্লাহ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

—কলিমুল্লাহ, ওঠ বাবা। আজ নতুন সূরা শুনাবি।

আট বছরের কলিমুল্লাহ ঘুমচোখে উঠে বসে।

মা সুরেতুন্নেসা বেগম গরম রুটি হাতে এগিয়ে আসেন।

—ভয় পাবি না। হুজুররা তো বাবার মতো হয়।

কলিমুল্লাহ মৃদু হেসে বলে,

—আমারও তাই মনে হয়, মা।

মা জানেন না, তাঁর এই কথাটাই আজ সবচেয়ে বড় ভুল প্রমাণ হতে যাচ্ছে।

মাদ্রাসার বারান্দায় ইতিমধ্যে জড়ো হয় অনেক শিশু।

সাদ, রুবেল, জসিম, মেহেদী, নাঈম, রাফসান, কলিমুল্লাহ...

সবাই একে অন্যের দিকে তাকায়।

তাদের চোখে পড়াশোনার আগ্রহ নেই।

আছে ভয়।

হুজুর আসছেন।

ইমরান হোসেন।

তার এক হাতে বেত।

অন্য হাতে মোবাইল ফোন।

তিনি পড়ানোর চেয়ে ভিডিও করতে বেশি ভালোবাসেন।

কোনো শিশু ভুল পড়লে তিনি হাসেন।

কেউ কাঁদলে আরও খুশি হন।

কখনো কান ধরে ওঠবস।

কখনো মাথায় আঘাত।

কখনো মুখে বেত।

আর সবকিছুই ভিডিও।

শিশুরা বুঝতে পারে না, তারা ছাত্র নাকি কোনো নিষ্ঠুর খেলার পুতুল।

সেদিন কলিমুল্লাহ একটি প্রশ্নের উত্তর ভুলে যায়।

তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে।

চোখে পানি জমে।

ইমরান মোবাইলটি অন করেন।

ভিডিও শুরু।

তারপর বেতটি ধীরে ধীরে কলিমুল্লাহর মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন।

ছেলেটি আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে চায়।

পারতে পারে না।

আবার বেত।

আবার।

আবার।

কলিমুল্লাহ দুই হাত দিয়ে বেত সরাতে থাকে।

চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরে।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদ আর রুবেলও কাঁদতে শুরু করে।

ইমরান তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,

—তোদেরও ভিডিও করব।

মুহূর্তেই সবাই চুপ হয়ে যায়।

শ্রেণিকক্ষটা যেন শিশুদের নয়, জল্লাদের কক্ষ হয়ে ওঠে।

দিন যায়।

ভিডিও জমতে থাকে।

একদিন কলিমুল্লাহ।

আরেকদিন সাদ।

তারপর রুবেল।

তারপর জসিম।

একজন নয়।

অনেক শিশু।

একই নির্যাতন।

একই হাসি।

একই মোবাইল।

একই নরপিশাচ।

কয়েক মাস পর ভিডিওগুলো একে একে ফেসবুকে প্রকাশ হতে থাকে।

মানুষ হতবাক।

সারা এলাকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

ঠিক তখনই লন্ডন থেকে ছুটিতে আসা একজন সিনিয়র হাইস্কুল শিক্ষক আবদুল মুক্তাদীর চৌধুরী বাজারে দাঁড়িয়ে ভিডিওটি দেখেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তিনি ধীরে ধীরে বলেন,

আমি চব্বিশ বছর থেকে ইংল্যান্ডে শিক্ষকতা করছি। সেখানে শিক্ষক হওয়ার আগে শুধু ডিগ্রি দেখানো হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, প্রশিক্ষণ, চরিত্র, অপরাধের ইতিহাস—সব যাচাই হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিবিএস (Disclosure and Barring Service) নামে কঠোর ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা। শিশুদের ক্ষতি করতে পারে—এমন সামান্য সন্দেহ থাকলেও কেউ শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

একজন যুবক প্রশ্ন করে,

—আমেরিকায়ও কি তাই?

 শিক্ষক মাথা নাড়েন। তিনি বলেন,

অবশ্যই। প্রায় সব অঙ্গরাজ্যেই ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড চেক, শিশু-নিরাপত্তা যাচাই, রেফারেন্স যাচাই, এমনকি আগের কর্মস্থলের রিপোর্টও দেখা হয়। কারণ তারা জানে, একজন অসুস্থ মানসিকতার শিক্ষক শত শত শিশুর জীবন নষ্ট করতে পারে। তাই শিক্ষক নিয়োগ দেবার আগে অবশ্যই একজন শিক্ষকের মানসিক ও চারিত্রিক ফিটনেস সার্টিকেট নিতে হয় নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। ওখানে কোন দুই নম্বরী কাজ চলে না। তারপর  অত্যন্ত আক্ষেপ করে আবার মুক্তাদীর সাহেব বলেন,

—শুধু ভাইবা আর লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেই উন্নত দেশে কাউকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় না। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের গায়ে কোন শিক্ষক বা পিতামাতা পর্যন্ত গায়ে দিতে পারেন না। ছাত্রছাত্রীদের খোঁচা দিয়ে কোন কথা বলতে পারবে না। এমনকি, ছাত্র যদি হেড টিচারকে অভিযোগ করে বলে যে, জনৈক শিক্ষক আমাকে জোরে ধমক দিয়েছেন এবং এবং আমি ভীত হয়েছি তাহলেও ঐ শিক্ষকের খবর আছে। এজন্যই ঐসব দেশের শিক্ষার্থীরা উদার ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশে আনন্দের সাথে বড় হয়। সবাই বিলাতী শিক্ষকের কথাগুলো শুনে কষ্টে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

—আমরা শুধু সনদ দেখি। মানুষটাকে দেখি না।

মুক্তাদীর সাহেব কলিমুল্লাহর ভিডিওর দিকে তাকিয়ে বলেন,

—যে শিশুদের কান্না দেখে আনন্দ পায়, সে শিক্ষক নয়। সে সমাজের জন্য চলমান বিপদ।

কলিমুল্লাহ সেদিন বাবার হাত শক্ত করে ধরে থাকে।

আগে সে বই দেখে হাসত।

এখন বেত দেখলেই কেঁপে ওঠে।

মাদ্রাসার নাম শুনলেই তার বুক ধড়ফড় করে।

রাতে ঘুম ভেঙে চিৎকার করে ওঠে।

সুরেতুন্নেসা বেগম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শুধু কাঁদেন।

তিনি বারবার নিজের সেই কথাটি মনে করেন—

"হুজুররা তো বাবার মতো হয়।"

কিন্তু সব বাবা সন্তানকে আগলে রাখেন।

আর কিছু মানুষ শিক্ষকের পোশাক পরে শিশুদের শৈশবকেই নির্যাতন করেন।

তাই শিক্ষক নিয়োগের আগে শুধু পরীক্ষার খাতা নয়, মানুষের বিবেকও পরীক্ষা করা জরুরি।

নইলে আরেকজন কলিমুল্লাহ জন্ম নেবে।

আর কোথাও না কোথাও, আরেকজন নরপিশাচ শিক্ষক মোবাইলের ক্যামেরা চালু করে আবারও লিখবে—

"পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে।"