বাংলাদেশ সংবাদ

আকাশে বিমানের জয়জয়কার, মাটিতে মানুষের হাহাকার!

আকাশে বিমানের জয়জয়কার, মাটিতে মানুষের হাহাকার!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৩ সেপ্টেম্বর :

মাটিতে শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন কমছে, কোথাও শ্রমিক ছাঁটাই, কোথাও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা। আর ঠিক এই সময়েই আকাশে বড় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীন—তিন পক্ষের কাছ থেকে যাত্রীবাহী ও যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগে সামনে এসেছে হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের এয়ারবাস বাংলাদেশ বিমানের জন্য আরও ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রায় ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার প্রস্তাব এগিয়ে চলছে।

অর্থাৎ বাণিজ্যিক বিমান ও সামরিক বিমান মিলিয়ে বাংলাদেশের আকাশে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।

বোয়িংয়ে ১৪ বিমান, মূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা

এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ বিমান। চুক্তিতে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স-৮।

বিমানগুলোর আনুমানিক তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। প্রথম বিমানটি ২০৩১ সালের নভেম্বরের দিকে সরবরাহ করার কথা এবং পুরো সরবরাহ শেষ হওয়ার কথা ২০৩৫ সালের মধ্যে। চুক্তিটির অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ভূমিকা রয়েছে এবং সরকারের সার্বভৌম গ্যারান্টির কথাও জানানো হয়েছে।

এটি সামরিক বিমান নয়। বাংলাদেশ বিমানের বহর আধুনিকায়ন, দীর্ঘপথের রুট বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এসব বিমান কেনা হচ্ছে।

ইউরোপ থেকেও কিনা হচ্ছে  এয়ার বাস

বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা এয়ারবাস বাংলাদেশ বিমানের কাছে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে রয়েছে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও—মোট ১০টি উড়োজাহাজ।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এয়ারবাসের এই প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি নয়। এর মূল্য, অর্থায়ন কাঠামো ও অন্যান্য আর্থিক শর্তও প্রকাশ্যে চূড়ান্ত হয়নি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি বিমানের চুক্তি এবং বোয়িংয়ের আরও ১১টি বিমান নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে।

ফলে এয়ারবাসের ১০টি বিমানকে এখনই বাংলাদেশের নিশ্চিত ব্যয় হিসেবে যোগ করা ঠিক হবে না।

চীনের ২০ যুদ্ধবিমানেও ২৮ হাজার কোটি

বাণিজ্যিক বিমান কেনার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও বড় ব্যয়ের প্রস্তুতি চলছে। চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৩০২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

এখানে শুধু যুদ্ধবিমানের দাম নয়; প্রশিক্ষণ, পরিচালনাসামগ্রী, কারিগরি ও রসদ সহায়তা, পরিবহন, বিমা, ভ্যাট এবং অবকাঠামো নির্মাণের মতো খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ১০ বছর ধরে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটিও এখনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি হিসেবে সই হয়নি; চুক্তির খসড়া ও আলোচনার প্রক্রিয়া চলছে।

দুই চুক্তি ও প্রস্তাবেই ৭৩ হাজার কোটি টাকার হিসাব

বোয়িংয়ের ১৪টি বিমানের আনুমানিক তালিকামূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর চীনের ২০টি যুদ্ধবিমানের প্রস্তাবিত প্যাকেজ ব্যয় প্রায় ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এয়ারবাসের ১০টি বিমানের মূল্য বাদ দিয়েই এই দুই পক্ষের বিমান কেনার ঘোষিত বা প্রস্তাবিত অর্থের অঙ্ক প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা

তবে এই ৭৩ হাজার কোটি টাকাকে একসঙ্গে নগদ পরিশোধের অর্থ হিসেবে দেখা যাবে না। বোয়িংয়ের অঙ্কটি আনুমানিক তালিকামূল্য, আর চীনের অঙ্কটি প্রস্তাবিত পূর্ণ প্যাকেজ ব্যয়। ঋণ, কিস্তি, সুদ, মূল্যছাড় ও চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত আর্থিক দায় ভিন্ন হতে পারে।

আকাশে বড় পরিকল্পনা, মাটিতে বড় সংকট

প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়।

বিমান কেনা হচ্ছে, কিন্তু যে অর্থনীতির ওপর এসব বিমান কেনার দায় পড়বে, সেই অর্থনীতির মাটির চিত্র কেমন?

শিল্প পুলিশের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ৪১৩টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২টি কারখানা আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৫০টির বেশি কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১০ থেকে ৫০ শতাংশে চলছে। ইতোমধ্যে কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে।

শুধু কারখানার মালিক নন, এর প্রভাব পড়ছে শ্রমিকের ঘরেও। আজকের মজুরি দিয়ে যার বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও বাজার খরচ চালানো কঠিন, তার কাছে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিমান কেনার খবর নিঃসন্দেহে অন্যরকম বাস্তবতা তৈরি করে।

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকেও সংকট তীব্র। সাম্প্রতিক রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার জরিপে ৭৮ শতাংশ আংশিক উৎপাদন বন্ধের কথা জানিয়েছে এবং ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে ক্রেতারা কাজের আদেশ কমিয়েছে বা বাতিল করেছে।

তার মধ্যেই আকাশে যোগ হচ্ছে নতুন বিমান।

বিমান বহর আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় কি না—এটি আলাদা প্রশ্ন। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিক করা প্রয়োজন কি না—সেটিও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এসব বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও কিস্তির দায়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং প্রত্যাশিত আয়—এসব হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

যুক্তরাষ্ট্র বোয়িং বিক্রি করতে চাইবে, ইউরোপ এয়ারবাস বিক্রি করতে চাইবে, চীন যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে চাইবে—এটাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক বাস্তবতা। প্রত্যেক নির্মাতারই নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করে।

কারণ বিমান শুধু কেনার টাকা দিয়েই শেষ হয় না। বিমান চালাতে জ্বালানি লাগে, প্রশিক্ষণ লাগে, পাইলট ও প্রকৌশলী লাগে, যন্ত্রাংশ লাগে, রক্ষণাবেক্ষণ লাগে। যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে যোগ হয় অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়।

তাই প্রশ্নটা শুধু—বাংলাদেশ কতগুলো বিমান কিনছে?

প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন কিনছে, কীভাবে কিনছে, কত টাকায় কিনছে এবং শেষ পর্যন্ত এই বিমানগুলো দেশের অর্থনীতিতে কতটা মূল্য ফেরত দেবে?

আকাশে বিমান উড়বে। কিন্তু তার ঋণ, কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ব্যয়ের বোঝা নামবে মাটিতে—বাংলাদেশের মানুষের অর্থনীতির ওপর।

এখন দেখার বিষয়, এই আকাশযাত্রা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়ে উঠবে, নাকি ভবিষ্যতের বাজেটে নতুন আরেকটি বড় দায় হয়ে দাঁড়াবে।