বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় একাকার, ঠেকায় সাধ্য কার?
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২২ সেপ্টেম্বর :
বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এখন এক অদ্ভুত যুদ্ধ চলছে। একদিকে হাম, অন্যদিকে ডেঙ্গু, তার সঙ্গে নিউমোনিয়া ও মৌসুমি শ্বাসতন্ত্রের নানা সংক্রমণ। চিকিৎসকদের ভাষায়, শিশু ওয়ার্ডগুলো যেন ছোট ছোট যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শয্যার অভাব, চিকিৎসক সংকট আর রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক হাসপাতালেই সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের একই জায়গায় চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে এমন দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনের। কোথাও হাম আক্রান্ত শিশুর পাশেই ডেঙ্গুর রোগী, কোথাও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নবজাতকের কয়েক হাত দূরে বসে আছে জ্বর-র্যাশে ভোগা আরেক শিশু। চিকিৎসকরা সতর্ক করলেও বাস্তবতা হচ্ছে—জায়গা নেই, জনবল নেই, সময় নেই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু রোগের সংকট নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণক্ষমতার বড় পরীক্ষা।
চলতি সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কয়েক হাজার বেড়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে চাপ তীব্র হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

অন্যদিকে হাম পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে রয়েছে। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের বড় জটিলতাগুলোর একটি হলো নিউমোনিয়া। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে হামের পর ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের একটি অংশ একই সঙ্গে হাম ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিচ্ছে। তার ওপর ডেঙ্গুর রোগী বাড়ায় শিশু ওয়ার্ডে চাপ আরও বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক হাসপাতালে আইসোলেশন বা পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে হাসপাতালে এসেই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে রোগীরা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই সংক্রমিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এটি হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, টিকাদানে ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না থাকায় রোগীরা ঢাকামুখী হচ্ছেন। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও নার্সের সংকট। আর চতুর্থত, হাসপাতালের শয্যা ও আইসোলেশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঢাকায় শয্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উপজেলা হাসপাতালগুলোকে কার্যকর করতে হবে, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর দিতে হবে।
হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া—তিনটি রোগের আঘাত একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে আজ স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। হাসপাতালের করিডোর, মেঝে আর বারান্দা পর্যন্ত রোগীতে ভরে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে, চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের উদাহরণ ছিল। ডেঙ্গু মোকাবিলাতেও নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, রোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের কাজ নয়; এটি টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং কার্যকর স্বাস্থ্য পরিকল্পনার সমন্বিত লড়াই।