২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৪ মে: ময়মনসিংহের ত্রিশাল এক ভিন্ন আবহে রূপ নেয় শনিবার (২৩ মে)। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর ও নিরাপত্তাবেষ্টিত। প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব শেষে তিনি ঘোষণা দেন—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে পালন করা হবে।

তিনি বলেন, প্রায় দুই দশক পর ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করতে পারায় সরকার গৌরববোধ করছে।
একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আবহমান ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নজরুলের জীবন ও দর্শন বিশ্বসাহিত্যের পরিমণ্ডলে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। তার চিন্তা ও জীবনবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। তিনি জাতীয় চেতনা, জাতীয় সত্তা ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
এ সময় তিনি ১৯১৪ সালে কবিকে আশ্রয় দেওয়া দারোগা রফিজ উল্লাহর অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মিরপুরে শিশু রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান জানান। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়েছে, আর রামিসার হত্যাকাণ্ড সেই অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ।
তিনি ঘোষণা দেন, শিশু ও নারী নির্যাতন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধের সাহস না পায়।
নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী দরিরামপুর এলাকার ‘দরিরামপুর ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। ১৯৭৯ সালে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে খালটির খনন শুরু করেছিলেন।
৪৭ বছর পর সেই স্মৃতিবিজড়িত খালে প্রধানমন্ত্রী নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে শ্রমিকদের হাতে তুলে দেন। দৃশ্যটি দেখে স্থানীয় প্রবীণরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এ সময় স্থানীয়রা খালের পাশের সড়ক পাকাকরণ এবং একটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নজরুলকে ঘিরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে কবির জানাজার খাটিয়া কাঁধে বহন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। আর ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া।
তিনি বলেন, গুণীজনকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান কমে না, বরং জাতি মহিমান্বিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন ত্রিশালের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান এবং স্মারক বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর।
অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কবিপৌত্রী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খিলখিল কাজী, ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এবং জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণা ও জীবনদর্শনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুইজন গুণী ব্যক্তিকে নজরুল পদক ও সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে নজরুল স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর তিনি অতিথি সারিতে বসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মরণে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
ত্রিশালের পুরো এলাকা জুড়ে এ দিন ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, কড়া নিরাপত্তা এবং ব্যাপক জনসমাগম।