কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫২ ।। যে কবির কাছে পূর্ণিমার চাঁদও ছিল ঝলসানো রুটি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫২ ।।  যে কবির কাছে পূর্ণিমার চাঁদও ছিল ঝলসানো রুটি

উৎসর্গ:

ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো,

অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে থাকা

এবং একটি বৈষম্যহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

কিছু কবিকে আমরা পড়ি সাহিত্য বোঝার জন্য। কিছু কবিকে পড়ি পরীক্ষার প্রয়োজনে। আর কিছু কবিকে পড়ি নিজের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আর কবি নজরুল আমার কাছে সেই শেষ ধরনের কবি। তাঁকে যত পড়ি, ততই মনে হয়—কবিতা কেবল সৌন্দর্যের কথা বলার জন্য নয়; কবিতা মানুষের ক্ষুধা, বঞ্চনা, স্বপ্ন ও অধিকারের কথাও বলতে পারে। সুকান্ত আমার কাছে এক বিষ্ময়কর কবি। কারণ পৃথিবীতে এত কম বয়সে এত জ্বালাময়ী কবিতা খুব কম কবিই লিখতে পেরেছেন।

আজ ১৫ আগস্ট (৩১ শে শ্রাবণ,১৩৩৩ বাংলা), কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মদিন। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ চলছে। ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতার কালীঘাটে মাতামহের বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই ক্ষণজন্মা কবি। তাঁর পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া গ্রামে। জন্ম কলকাতায় হলেও তাঁর শিকড় এই বাংলার মাটিতে। তাই সুকান্তকে আমার কাছে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের কবি মনে হয় না—তিনি দুই বাংলার মানুষেরই কবি।

সুকান্তের পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যেও রয়েছে এক চমৎকার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগসূত্র। তাঁর পরিবারেরই আরেক শাখার সন্তান ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বুদ্ধদেবের বাবা নেপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন সুকান্তের প্রথম চাচাতো ভাই। সেই সূত্রে বুদ্ধদেব ছিলেন সুকান্তের ভাতিজা। অর্থাৎ একই পরিবারের এক প্রজন্মে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবী কবি সুকান্ত, আর পরবর্তী প্রজন্মে সেই পরিবার থেকেই উঠে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগী রাজনীতিক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পারিবারিক এই সম্পর্ক সুকান্তের জীবন ও উত্তরাধিকারের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক।

সুকান্তের জীবন অবশ্য খুব দীর্ঘ হয়নি। মাত্র ২০ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে, যক্ষ্মায় তাঁর মৃত্যু হয়। জীবন থেমে গিয়েছিল একুশের আগেই। কিন্তু তাঁর কবিতার বয়স থামেনি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর কবিতার প্রয়োজন যেন তত বেড়েছে।

এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের এই বিপ্লবী চেতনার কবির জন্মশতবর্ষ। তাঁর কবিতা, জীবনাদর্শ ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শতবর্ষে এসে তাঁকে স্মরণ করার এই আয়োজন আসলে শুধু একজন প্রয়াত কবিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং নিজেদের সময়কে তাঁর কবিতার আয়নায় দেখারও একটি সুযোগ।

সুকান্তের কবিতার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। বিশেষ করে সেই মানুষ, যে শ্রম করে অথচ অভাবের মধ্যে বেঁচে থাকে; যে উৎপাদন করে, কিন্তু উৎপাদনের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়; যে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু বৈষম্যের দেয়ালে বারবার আটকে যায়।

তাঁর কবিতায় সাম্যবাদ ও দেশাত্মবোধ ছিল গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর জীবন ও কবিতা যেন একই সুতায় বাঁধা। তাই সুকান্তকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর কবিতার শব্দ পড়লেই হয় না; বুঝতে হয় তাঁর সময়কে, তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাকে, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে।

তিনি রাজনীতিকে শুধু স্লোগানে পরিণত করেননি; শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। আর সেই শিল্পকে করেছিলেন মানবমুক্তির হাতিয়ার। সুকান্তের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পৃক্ততা ছিল তাঁর কবিসত্তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছাত্রজীবনেই তিনি বামপন্থী রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এরপর তিনি শুধু পার্টির সদস্য হিসেবেই থাকেননি, সক্রিয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হন। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দৈনিক স্বাধীনতা-এর ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। একই সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ‘আকাল’ সংকলন সম্পাদনা করেন।

তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস তাঁর কবিতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, শোষণ-বঞ্চনা ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের অস্ত্র। তবে সুকান্তের কবিতাকে শুধু দলীয় রাজনীতির প্রচার হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যিক শক্তিকে খাটো করা হবে; বরং মানুষের মুক্তি, সাম্য, ক্ষুধামুক্তি ও শোষণহীন সমাজের যে আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে, সেটিই তাঁর কমিউনিস্ট রাজনৈতিক চেতনার মানবিক ভিত্তি।

এই জায়গাটিই সুকান্তকে আমার কাছে এত প্রিয় করে তোলে।

তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ—

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

কত সহজ দুটি পঙ্‌ক্তি। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবীর ছবি। যে মানুষের পেটে খাবার নেই, তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের সৌন্দর্যও ম্লান। তার কাছে রোমান্টিকতার চেয়ে জরুরি এক টুকরো রুটি।

সুকান্ত সেই ক্ষুধার্ত মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখেছিলেন।

তাঁর কবিতায় তাই দারিদ্র্য কোনো পরিসংখ্যান নয়, শ্রমিক কোনো রাজনৈতিক শব্দ নয়, ক্ষুধা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। সবকিছুই জীবন্ত মানুষের অভিজ্ঞতা। এ কারণেই তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, কবি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।

সুকান্তকে শুধু ‘কিশোর কবি’ বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি অল্প বয়সে লিখেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতার বিষয় ছিল পরিণত এক পৃথিবী—যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শোষণ, বৈষম্য, ক্ষুধা, শ্রম এবং মানুষের মুক্তি।

‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—

“আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।”

এই স্পর্ধা শুধু বয়সের স্পর্ধা নয়। অন্যায়কে মেনে না নেওয়ার স্পর্ধা। মাথা নত না করার স্পর্ধা। একটি অন্যরকম পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা।

সুকান্তের কবিতায় দেশও আছে, মানুষের মুক্তির স্বপ্নও আছে। ‘লেনিন’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘হে মহাজীবন’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’—বিভিন্ন কবিতায় তাঁর সময়, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর পাওয়া যায়। ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’, ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’, ‘বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি’—এমন অনেক রচনাও মানুষের চেতনায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর বহু কবিতা পরে গান হিসেবেও মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।

এই কারণেই সুকান্ত শুধু পাঠ্যবইয়ের কবি নন। তিনি কণ্ঠের কবি, মিছিলের কবি, শ্রমজীবী মানুষের কবি, তরুণের কবি।

তাঁকে নিয়ে জন্মশতবর্ষের আলোচনায় একটি কথা বারবার ফিরে আসে—সুকান্ত আজও প্রাসঙ্গিক। কথাটি সত্য। কারণ পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে; কিন্তু বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার প্রশ্ন পুরোপুরি শেষ হয়নি।

মানুষ যত দিন সমান অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজের জন্য সংগ্রাম করবে, তত দিন সুকান্তের কবিতা সেই সংগ্রামের পাশে দাঁড়াবে।

একজন কবির শততম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় কী?

আমার মনে হয়, তাঁর ছবি টাঙানো নয়। তাঁর কবিতা পড়া। তাঁর সময়কে বোঝা। তাঁর প্রশ্নগুলোকে নিজেদের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

কারণ সুকান্ত আমাদের শিখিয়েছেন, কবিতা শুধু ফুল, পাখি, চাঁদ, নদী আর প্রেমের কথা বলবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কবিতা ক্ষুধার কথা বলতে পারে। প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে। মানুষের অধিকার দাবি করতে পারে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখাতে পারে।

আর সেই কারণেই তাঁর কবিতা বারবার আমাদের কাছে ফিরে আসে।

আমার প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন আমাকে আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—জীবন দীর্ঘ হলেই কেবল মানুষ বড় কাজ করে যায় না। কখনো কখনো একটি ছোট জীবনও একটি দীর্ঘ ইতিহাসের সমান হয়ে উঠতে পারে।

সুকান্ত মাত্র কুড়ি বছর বয়সে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কবিতা আজ একশ বছরে পা দিচ্ছে। তাঁর শরীর নেই, কিন্তু তাঁর প্রশ্ন আছে। তাঁর কণ্ঠ নেই, কিন্তু তাঁর উচ্চারণ আছে। তাঁর জীবন নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে শুধু শ্রদ্ধা জানাতে চাই না। তাঁকে আবার পড়তে চাই। তাঁর পুরো রচনাবলী এখনো পড়ি। আমাকে উদ্দীপ্ত ও বিষ্মিত করে তাঁর কবিতাবলী।

বিশেষ করে তরুণদের হাতে তুলে দিতে চাই সুকান্তের কবিতা। কারণ তিনি শেখান—বয়স ছোট হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন ছোট হতে নেই। জীবন ছোট হতে পারে, কিন্তু মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কাজ ছোট হতে নেই।

কলকাতায় জন্ম নেওয়া সেই তরুণ কবির শিকড় যে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামেও প্রোথিত, সেটিও আমাদের এক গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। সীমান্ত মানুষের ইতিহাসকে ভাগ করতে পারে, কিন্তু কবিতার শিকড়কে ভাগ করতে পারে না।

সুকান্ত তাই আমার কাছে শুধু একজন প্রিয় কবি নন। তিনি আমার কাছে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো কবিতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

শুভ জন্মশতবর্ষ, প্রিয় কবি।

আপনি খুব অল্প সময় বেঁচেছিলেন। কিন্তু আপনার কবিতা আমাদের সঙ্গে থেকে গেছে—ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে, প্রতিবাদী তরুণের কণ্ঠে, শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নে এবং আমাদের বিবেকের গভীরে।

আপনার কবিতার মতোই—রুটির প্রশ্নটি আজও শেষ হয়নি। তাই আপনাকেও পড়া শেষ হয়নি।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ১৫ আগস্ট, ২০২৬