ইংল্যান্ডের স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে পিজা ও সসেজ ইত্যাদি খাবারের প্রাধান্য—পুষ্টি হারাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ইংল্যান্ডের স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে পিজা ও সসেজ ইত্যাদি খাবারের প্রাধান্য—পুষ্টি হারাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ মার্চ : 

ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে মধ্যাহ্নভোজ এখন আর আগের মতো নয়। একসময় যেখানে শিক্ষার্থীরা বসে সুষম খাবার খেত, সেখানে এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। পিজার স্লাইস, সসেজ রোল, পানিনি—এইসব দ্রুত নেওয়া যায় এমন খাবারই দখল করে নিচ্ছে ক্যান্টিনের প্রধান স্থান। বিষয়টি নতুন নয়, তবে এবার এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘বাইট ব্যাক’ এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা, যার পেছনে রয়েছেন দীর্ঘদিনের খাদ্য-সংস্কারক জেমি ওলিভার

প্রতিবেদনটি আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা আর খাবারকে পুষ্টির উৎস হিসেবে নয়, বরং সময় বাঁচানোর উপকরণ হিসেবে দেখছে। লাঞ্চ ব্রেক ছোট, লাইন দীর্ঘ, বিকল্প সীমিত—এই তিন বাস্তবতা মিলেই তৈরি হয়েছে “গ্র্যাব-অ্যান্ড-গো” সংস্কৃতি। ফলাফল? খাবার হচ্ছে দ্রুত, কিন্তু পুষ্টি হারাচ্ছে নীরবে।

এটি কেবল খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত। যখন একটি স্কুলের ক্যান্টিনে পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে সহজলভ্য অস্বাস্থ্যকর খাবার বেশি বিক্রি হয়, তখন বোঝা যায়—সেখানে নীতির চেয়ে বাজারই শক্তিশালী।

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহে একাধিকবার এই ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। এমনকি সকালের বিরতিতেও একই প্রবণতা। এই বাস্তবতা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, বরং ক্লাসরুমে মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে। ক্ষুধার্ত বা অপুষ্ট শরীর নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীই তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে এগোতে পারে না।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—এই পরিস্থিতি নতুন কোনো সংকটের কারণে তৈরি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। স্কুল ফুড স্ট্যান্ডার্ডস বহু আগে থেকেই রয়েছে, কিন্তু তার প্রয়োগ কোথায়? কে নজরদারি করছে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর নেই। ফলে নিয়ম আছে, কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে।

একজন শিক্ষার্থী—এখানে আমরা তাকে ইমরান কবির নামে উল্লেখ করছি—খুব সরল ভাষায় বলেছে, “লাঞ্চের সময় সবাই দৌড়ে যায় সেই জায়গায়, যেখানে দ্রুত খাবার পাওয়া যায়। মূল খাবারের লাইনে দাঁড়ানোর সময় নেই।” এই এক বাক্যেই পুরো সমস্যার সারাংশ লুকিয়ে আছে।

সরকার অবশ্য নতুন করে খাদ্যমান উন্নয়নের কথা বলছে। কম চর্বি, কম লবণ, কম চিনি—এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নীতিমালা ঘোষণার বাইরে বাস্তবায়নের কাঠামো কতটা শক্তিশালী? Ofsted বা অন্য কোনো সংস্থাকে কি এই দায়িত্ব দেওয়া হবে? নাকি আগের মতোই এটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

বাস্তবতা হচ্ছে, স্কুল ক্যান্টিন এখন শুধু একটি খাবারের জায়গা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে লাভের হিসাবও কাজ করে। বড় খাদ্য কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্কুলগুলোকে এমন এক চক্রে আটকে ফেলছে, যেখানে স্বাস্থ্য নয়, বরং বিক্রিই প্রধান হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কারণ, শিশুর খাদ্যাভ্যাস কেবল তার বর্তমান নয়, তার ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করে। আজকের এই “দ্রুততার সংস্কৃতি” যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে আগামী দিনের সমাজকেও এর মূল্য দিতে হবে।

প্রশ্নটি তাই শুধু—শিক্ষার্থীরা কী খাচ্ছে—এতটুকুই নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর: আমরা কি সত্যিই একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, নাকি সুবিধা ও লাভের কাছে সেই লক্ষ্যকে বিসর্জন দিচ্ছি?