ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নারী-শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র: ২০২৫ সালে হত্যা করা হয়েছে ৭৫৬ নারীকে

নারী-শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র: ২০২৫ সালে হত্যা করা হয়েছে ৭৫৬ নারীকে

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৮ জুলাই:

বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, আত্মহত্যা, যৌতুক নির্যাতন ও বাল্যবিয়ের মতো সহিংসতার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক সমীক্ষায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এ সময়ে ৭৫৬ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৭৬ জন নারী ধর্ষণের শিকার এবং ১২৫ জন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে দলবদ্ধ ধর্ষণ, আত্মহত্যা ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায়। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১৪২ জন কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, ২০৩ জন আত্মহত্যা করেছে এবং ১১৭ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ২০ হাজার ৬৯১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষায় এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ প্রতিবেদন তুলে ধরে।

সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার খবর বিশ্লেষণ করে এ সমীক্ষা তৈরি করা হয়েছে।

শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই নিরাপদ নন

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দেশের নারী নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব নারী—কেউই সহিংসতার ঝুঁকির বাইরে নেই।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা। ধর্ষণের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী দায়ী নয়; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক পরিবেশ, যা অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৪ সালে করা এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন।

বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে ঝুঁকি

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শুধু রাস্তাঘাট বা জনসমাগমস্থল নয়, এখন বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনেক নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গৃহিণীরা হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশ ঘটনার শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণচেষ্টার ৮০ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৭ শতাংশ, দলবদ্ধ ধর্ষণের ৩৯ শতাংশ এবং বাল্যবিয়ের শতভাগ ঘটনার ভুক্তভোগী।

বিচারহীনতা অপরাধ বাড়াচ্ছে

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সামাজিক প্রবণতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।

সংগঠনটি বলেছে, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ কোনোভাবেই স্থানীয় সালিশ বা আপসের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। এসব ঘটনায় আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ, অপরাধীদের জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

ডেইলি ভয়েস অব পিপল মন্তব্য:
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা শুধু একটি সামাজিক ইস্যু নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার প্রশ্ন। পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা একেকটি জীবনের বেদনা ও একটি পরিবারের ধ্বংসের গল্প বহন করে। বিচার নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে।