তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ব্রিটেনে অবৈধ অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে নতুন বিল, আপিল ব্যবস্থায় আসছে বড় পরিবর্তন
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৩০ অক্টোবর :
ব্রিটেনে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি এবং যাদের থাকার বৈধ অধিকার নেই তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে অভিবাসন ও আশ্রয় আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এ উদ্দেশ্যে পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়েছে নতুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল ২০২৬। প্রস্তাবিত এই আইনে অভিবাসনসংক্রান্ত আপিল ব্যবস্থায়ও আসছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
নতুন বিলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তির জন্য গঠন করা হবে একটি নতুন স্বাধীন কর্তৃপক্ষ। এর নাম দেওয়া হয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট ইমিগ্রেশন আপিলস অথরিটি (আইআইএএ)। বর্তমানে আদালতের অধীনে ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যেসব আপিল নিষ্পত্তি হয়, নতুন ব্যবস্থা চালু হলে ধীরে ধীরে সেই দায়িত্ব নতুন কর্তৃপক্ষের হাতে যাবে।

সরকারের দাবি, বর্তমানে অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত আপিলের বিপুল জট তৈরি হয়েছে। ফলে আবেদনকারীদের সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে দ্রুত শুনানি ও সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একাধিক আপিলের সুযোগ সীমিত হচ্ছে
নতুন বিল অনুযায়ী, অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট আপিল প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিজের সব যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
বর্তমানে কোনো আবেদনকারী প্রথম আপিলে ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট আইনি শর্তে পরবর্তী আপিলের সুযোগ পেতে পারেন। নতুন ব্যবস্থায় আপিলের পথ আরও সীমিত করা হচ্ছে।
প্রথম আপিলে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পর্যায়ে আপার ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ থাকবে মূলত আইনের ব্যাখ্যা বা প্রয়োগে ভুল হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে অনুমতি পাওয়ার ভিত্তিতে।
সরকারের বক্তব্য, একই বিষয়ে বারবার আপিল করে বহিষ্কার বা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ বন্ধ করাই এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য।

আশ্রয়ের আবেদন দেরিতে করলে বাড়বে জটিলতা
নতুন বিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব অভিবাসীকে ব্রিটেন থেকে বহিষ্কার বা ফেরত পাঠানোর নোটিশ দেওয়া হবে, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্রিটেনে থাকার পক্ষে সব দাবি ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
এ জন্য চালু করার প্রস্তাব রয়েছে ক্লেইম নোটিশ ব্যবস্থা।
কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজের আশ্রয়, মানবাধিকার বা আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার দাবি উত্থাপন না করলে পরবর্তী সময়ে সেই দাবি বিবেচনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বহিষ্কারের শেষ মুহূর্তে নতুন করে আশ্রয়ের আবেদন করে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার প্রবণতা বন্ধ করতে চায় সরকার।
তবে যুক্তিসংগত কারণে কেউ আগে তথ্য বা প্রমাণ দিতে না পারলে তার বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ দেরিতে আবেদন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন বাতিল হয়ে যাবে, এমন নয়।

পরিবার নিয়ে বসবাসের অধিকারেও পরিবর্তনের প্রস্তাব
নতুন বিলের মাধ্যমে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল ৮ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে।
এই অনুচ্ছেদে ব্যক্তির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন রক্ষার অধিকার স্বীকৃত।
বর্তমানে কোনো অভিবাসীর ব্রিটিশ নাগরিক স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান কিংবা দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তিনি ব্রিটেনে থাকার আবেদন করতে পারেন।
নতুন প্রস্তাবে এসব আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে ব্রিটেনে বসবাসরত শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার নিয়ম আরও নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফলে ব্রিটিশ নাগরিক সন্তান রয়েছে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন—এমন অভিবাসীদের কিছু আবেদনেও নতুন নিয়মের প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও আইনি শর্ত অনুযায়ী বিবেচিত হবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের সরকারি সহায়তার অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ
নতুন বিলে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ও আর্থিক সহায়তা নিয়েও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর নিজের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের কাছ থেকে আবাসন ও অন্যান্য সহায়তার খরচের অংশবিশেষ ফেরত নেওয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ সরকারি অর্থায়নে দীর্ঘদিন আবাসন ও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পর কারও নিজের অর্থসম্পদ রয়েছে বলে প্রমাণিত হলে তার কাছ থেকে সহায়তার খরচ আদায়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
সরকারের যুক্তি, করদাতাদের অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং আশ্রয় ব্যবস্থার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
জুনে পার্লামেন্টে উত্থাপন, অক্টোবরেও চলছে আলোচনা
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিলটি ২০২৬ সালের ৩০ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়। ৮ অক্টোবর সরকার বিলটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে।
১৩ অক্টোবর হাউস অব কমন্সের কমিটি পর্যায়ে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়। ২৯ ও ৩০ অক্টোবরও বিলটির বিভিন্ন সংশোধনী নিয়ে পার্লামেন্টে কার্যক্রম চলেছে।
অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিলটি চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের বিভিন্ন ধাপ শেষ করে রাজকীয় সম্মতি পাওয়ার পরই এটি আইনে পরিণত হবে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ?
ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নতুন বিলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বহু বাংলাদেশি নাগরিক কর্মসংস্থান, পরিবার, পড়াশোনা ও বিভিন্ন অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষ করে যাদের আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন, যাদের আপিল চলছে কিংবা যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার, নতুন বিলের সব বিধান এখনই কার্যকর হয়নি। বৈধ ভিসাধারী, স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি, আশ্রয়প্রার্থী এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারী—সবার আইনি অবস্থান এক নয়।
কোনো ব্যক্তির ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া, ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া কিংবা বহিষ্কারের নির্দেশ পাওয়া—প্রতিটি পরিস্থিতির আইনি পরিণতিও আলাদা।
তাই শুধু সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের অভিবাসন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিবন্ধিত ইমিগ্রেশন পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, নতুন আইনের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত, কার্যকর আপিল ব্যবস্থা এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। তবে মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্তের মান এবং আপিলের সুযোগ সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নতুন বিলটি কার্যকর হলে ব্রিটেনের অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থী ও বহিষ্কারের মুখে থাকা ব্যক্তিদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও সময়সীমাবদ্ধ ও কঠোর হতে পারে।