ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
যুক্তরাজ্যে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের সরকারি পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা: প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন স্থূলতায় আক্রান্ত
স্বাস্থ্য ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ৩০ অক্টোবর:
যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধমান স্থূলতার সমস্যা আগামী ১০ বছরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনার সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একদল এমপি। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অব্যাহত থাকলে স্থূলতার মহামারি মোকাবিলার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি দায়িত্ব নিয়ে নতুন ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
হাউস অব কমন্সের স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা বিষয়ক সিলেক্ট কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডের জন্য সরকারের ঘোষিত ১০ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় স্থূলতা নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

সরকার এক বছরেরও বেশি সময় আগে ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী এক দশকের মধ্যে দেশ থেকে স্থূলতার মহামারি দূর করা হবে। কিন্তু এই লক্ষ্য কীভাবে পরিমাপ করা হবে, কোন মন্ত্রণালয় কী দায়িত্ব পালন করবে এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব মৌলিক প্রশ্নেরও এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন দলের এমপিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বলেছে, স্থূলতার মহামারি বন্ধ করার লক্ষ্য প্রশংসনীয় হলেও সরকারের বর্তমান অঙ্গীকার ও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর তাদের আস্থা নেই। দ্রুত পরিকল্পনার পরিবর্তন না আনলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নেতৃত্ব অপরিহার্য। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বিশেষ ক্যাবিনেট কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকি এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ইংল্যান্ডে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন স্থূলতায় আক্রান্ত
সর্বশেষ সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩০ শতাংশ স্থূলতায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা মিলিয়ে এই হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় দুজনই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজনের সমস্যায় রয়েছেন।
শিশুদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন অথবা স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৯০-এর দশক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু—উভয় বয়সী মানুষের মধ্যে স্থূলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধির গতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আক্রান্তের সংখ্যা কমার সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ
সরকারের বর্তমান কৌশলের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার মধ্যে যথাযথ পার্থক্য না রাখার বিষয়টি চিহ্নিত করেছে সংসদীয় কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে মানুষ যাতে স্থূলতায় আক্রান্ত না হয়, সে জন্য অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন, বিপণন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে যারা ইতোমধ্যে স্থূলতায় আক্রান্ত, তাদের জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা।
এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার কারণে অতীতে একের পর এক সরকারের পরিকল্পনায় অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে এবং কার্যকর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছে কমিটি।
এমপিদের সুপারিশ, স্থূলতা কমানোর লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত ও পরিমাপযোগ্য করতে হবে। আগামী কয়েক বছরে কী পরিমাণ অগ্রগতি অর্জিত হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এতে সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা সংসদে যাচাই করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য পৃথক প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কর্মসূচি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উৎস উল্লেখ করে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সংসদে এই পরিকল্পনা উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
খাদ্যশিল্পের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ চান এমপিরা
কমিটির চেয়ারম্যান ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের এমপি লায়লা মোরান বলেছেন, স্থূলতা মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। খাদ্যশিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও সরকারকে প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
তিনি অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয়ের বিজ্ঞাপন এবং প্রচারণা আরও নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য নিশ্চিত করা, সুপারমার্কেটগুলোকে স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রিতে উৎসাহিত করা এবং স্কুলের আশপাশে ফাস্টফুডের দোকান নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
লায়লা মোরানের মতে, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নেতৃত্ব না দিলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হবে না। ফলে সরকারের উচ্চাভিলাষী স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু এনএইচএসের ওপর চিকিৎসার চাপ কমবে না, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সরকারের বক্তব্য: ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু পদক্ষেপ
সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, স্থূলতা বর্তমানে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে অসুস্থতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাত ৯টার আগে টেলিভিশনে এবং অনলাইনে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে কম স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে একসঙ্গে বেশি পণ্য কিনলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার মতো মূল্যপ্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্কুলের আশপাশে নতুন ফাস্টফুডের দোকান স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
ইতোমধ্যে স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যও চিকিৎসা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের চিকিৎসাগত প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের জন্য এনএইচএসের মাধ্যমে ওজন কমানোর ওষুধ পাওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তবে সরকারের এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও সংসদীয় কমিটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ দিয়ে স্থূলতার মতো জটিল জাতীয় সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নেতৃত্ব।