ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দেশে ২১ মাসে হামলায় আহত ১,০৪৩ পুলিশ সদস্য, দায়িত্ব পালনে বাড়ছে ঝুঁকি

দেশে  ২১ মাসে হামলায় আহত ১,০৪৩ পুলিশ সদস্য, দায়িত্ব পালনে বাড়ছে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৩১ অক্টোবর :

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্রমাগত হামলার মুখে পড়ছেন পুলিশ সদস্যরা। কখনো মাদকবিরোধী অভিযান, কখনো আসামি গ্রেফতার, আবার কখনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। গত ২১ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ জন পুলিশ সদস্য। একই সময়ে বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও জনআস্থা ও পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে পুলিশের ওপর হামলায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ জন সদস্য। এর মধ্যে ২০২৫ সালে আহত হন ৬০১ জন এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আহত হয়েছেন ৪৪২ জন। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৯ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।

তবে আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কতজন মারা গেছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযান পুলিশের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। এ ছাড়া অপরাধী গ্রেফতার, জনতার সংঘবদ্ধ হামলা বা মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়ও হামলার শিকার হচ্ছেন সদস্যরা।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

পুলিশের ওপর হামলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে গত শনিবার ১৯ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে দুজনকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এর আগের দিন গাজীপুরের জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। মাদকসহ আটক দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।

গত ৭ অক্টোবর খুলনায় দায়িত্ব শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম। তার দুই হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর তাকে দেখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্য এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজধানীর রায়েরবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হন চার পুলিশ সদস্য। পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আসামি গ্রেফতার ও অভিযান পরিচালনার সময়ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, হামলাকারীদের গ্রেফতার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চলছে। পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাহিনীর ভেতরেও অপরাধের অভিযোগ

পুলিশের ওপর বাইরের হামলার পাশাপাশি বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে সাম্প্রতিক সময়ে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, মাদকাসক্তি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ার পর ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগও রয়েছে।

পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেঞ্জ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।

একদিকে অপরাধ দমনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, অন্যদিকে বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ—দুই দিকের চাপের মধ্যে রয়েছে পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।