তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ, নয় গুলির দাবিতে জাল চিকিৎসাপত্রের সন্ধান
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৩১ অক্টোবর :
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শরীরে নয়টি গুলি লাগার অভিযোগ তুলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন এক যুবক। কিন্তু পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। তদন্তকারীদের ভাষ্য, মামলার বাদী নূর হোসেনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার যে কাগজপত্র তিনি জমা দিয়েছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে হাসপাতালের মূল নথির গুরুতর অসংগতি ধরা পড়েছে।
এ ঘটনায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৮৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে প্রতিবেদনটি দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক উক্যমং রাখাইন।
তবে পুলিশের এই সুপারিশের পরও মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাদীর প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
অভিযোগের শুরু যেভাবে
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। ওই সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ করেন তিনি।
বাদীর দাবি ছিল, তাঁর পিঠে ছয়টি, বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপর দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে। মোট নয়টি গুলিতে আহত হয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। পরে তাঁকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এজাহারে আরও বলা হয়, আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন নূর হোসেন। মামলায় পরবর্তী সময়ে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪ জনে।
হাসপাতালের নথি যাচাইয়ে বেরিয়ে আসে অসংগতি
মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে বাদীর চিকিৎসার কাগজপত্রের সত্যতা। নূর হোসেন এজাহারের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থাপত্র ও অন্যান্য নথি জমা দিয়েছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা হাসপাতালের মূল রেজিস্টার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে দেখতে পান, অভিযোগে উল্লেখ করা তারিখে নূর হোসেন নামে কোনো ব্যক্তি সেখানে চিকিৎসা নেননি।
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসাপত্রের অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমত, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকেরা সাধারণত হাতে লিখে ব্যবস্থাপত্র দেন। কিন্তু বাদীর জমা দেওয়া ব্যবস্থাপত্রটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা।
দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা ক্যাশ মেমো নম্বরটি যাচাই করে দেখা যায়, সেটি ৫৪ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার নামের অন্য এক রোগীর নামে বরাদ্দ ছিল। একইভাবে ব্যবহৃত পেশেন্ট আইডি নম্বরটি পাওয়া যায় ৩২ বছর বয়সী জুয়েল নামের আরেক রোগীর ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ, চিকিৎসার প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া নথির নম্বরগুলো হাসপাতালের প্রকৃত রোগীদের তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে, কিন্তু সেই রোগীরা নূর হোসেন নন।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, এসব তথ্য থেকে বাদীর চিকিৎসার দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের রেকর্ডে তাঁর চিকিৎসা গ্রহণের কোনো প্রমাণও মেলেনি।
আহতদের সরকারি তালিকাতেও নাম নেই
পুলিশের তদন্তে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশিত সরকারি গেজেটেও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।
তবে শুধু সরকারি তালিকায় নাম না থাকাই কারও আহত হওয়ার দাবিকে চূড়ান্তভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে না। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের মূল নথি, চিকিৎসাপত্রের নম্বর, ব্যবস্থাপত্রের ধরন এবং অন্যান্য তথ্য একত্রে বিবেচনা করেছে তদন্ত সংস্থা।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় বাদীর আহত হওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে আহত না হয়েও অসৎ উদ্দেশ্যে আহত হওয়ার ঘটনা সাজিয়ে মামলাটি করা হয়েছে।
পুলিশের এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই মামলার ৮৪ আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান।
এ ছাড়া রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন এবং মহিলা লীগ নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও তাঁদের কাউকে এই মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে নতুন করে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁরা আগে থেকেই অন্য মামলায় কারাগারে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের অনুমোদনে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কি আদালত?
মামলার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া এবং চিকিৎসার নথি জাল বলে উল্লেখ করার পর বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা উক্যমং রাখাইন জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে বাদীর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।
এদিকে বাদী নূর হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ফলে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানিতে এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হতে পারে।
মিথ্যা মামলা হলে বিচারব্যবস্থার দায়ও কম নয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকৃতপক্ষে যারা গুলিবিদ্ধ, নির্যাতিত কিংবা নিহত হয়েছেন, তাঁদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যদি মিথ্যা তথ্য ও জাল নথি দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যাচেষ্টা মামলায় জড়িয়ে দেন, সেটিও বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
একটি হত্যাচেষ্টা মামলা শুধু কাগজে লেখা অভিযোগ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরিবারের নিরাপত্তা। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো হলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও আইনি অধিকারও সরাসরি প্রভাবিত হয়।
এই মামলায় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে মামলা দায়ের ও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কীভাবে এমন গুরুতর অভিযোগ আদালত পর্যন্ত পৌঁছাল? দ্বিতীয়ত, জাল চিকিৎসাপত্র ব্যবহারের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এর দায় কারা বহন করবেন?
তবে তদন্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয়। আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই মামলাটির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের দাবি যেমন ন্যায়সংগত, তেমনি মিথ্যা অভিযোগে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার নিশ্চয়তাও আইনের শাসনের অপরিহার্য শর্ত। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।