‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইনি লড়াই, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতের একাধিক আদেশ

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইনি লড়াই, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতের একাধিক আদেশ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৩১ অক্টোবর: 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। এর মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন ঘিরে নজিরবিহীন আইনি বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আলাস্কায় গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচন নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত জোরদার, ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে সমন এবং ভোট গণনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতের একাধিক আদেশ—সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন রাজনীতি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগেই ৪ কোটি ৯০ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক আগাম ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একই সময়ের তুলনায় এবার আগাম ভোটের সংখ্যা বেশি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আলাস্কায় একই নামের দুই প্রার্থী, তদন্তে এফবিআই

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত আইনি বিরোধের একটি তৈরি হয়েছে আলাস্কায়। সেখানে রিপাবলিকান দলের বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ব্যালটে রয়েছেন একই ধরনের নামের আরেক প্রার্থী ড্যানিয়েল জে সুলিভান জুনিয়র।

অভিযোগ উঠেছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষককে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একই নামের কারণে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে রিপাবলিকান প্রার্থীর ভোট কমিয়ে দেওয়া।

নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশের পর তদন্তের গতি বাড়িয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ। আলাস্কার শীর্ষ ফেডারেল আইন কর্মকর্তা মাইকেল হেইম্যান জানিয়েছেন, তদন্তে এফবিআইয়ের জনবল বাড়ানো হয়েছে এবং একাধিক প্রসিকিউটরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৩০ অক্টোবর বিচার বিভাগ আদালতে নতুন আবেদন করে। এতে রিপাবলিকান প্রার্থী অল্প ব্যবধানে হেরে গেলে আলাস্কা অঙ্গরাজ্য যেন নির্বাচনী ফল অনুমোদন করতে না পারে, সেই নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ড্যান সুলিভানের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল সুলিভান জুনিয়রও পেলটোলার প্রচারশিবিরের সঙ্গে সমন্বয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রয়টার্স জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা এখনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বড় আইনি ধাক্কা

ক্যালিফোর্নিয়ায় অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের ব্যালট আলাদা করে রাখার দাবি জানিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

বিচার বিভাগের বক্তব্য ছিল, সন্দেহভাজন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের ব্যালট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়।

কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা এই তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, তালিকায় বৈধ মার্কিন নাগরিকদের নামও রয়েছে। ফলে ব্যালট আলাদা করার উদ্যোগে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩০ অক্টোবর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালত ২-১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট ভোটারদের ব্যালট আলাদা করতে গেলে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুরুতর বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

একই দিনে ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক ফেডারেল বিচারক নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো বা ফৌজদারি মামলার হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ থেকে বিচার বিভাগকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।

অর্থাৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালত সরাসরি অবস্থান নিয়েছে।

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে গ্র্যান্ড জুরির সমন

ক্যালিফোর্নিয়ায় তদন্তের পরিধিও বাড়িয়েছে বিচার বিভাগ। লস অ্যাঞ্জেলেস ও অরেঞ্জ কাউন্টিসহ বিভিন্ন এলাকার নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে গ্র্যান্ড জুরির সমন পাঠানো হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমনে ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই, নির্বাচনী নথিপত্র এবং সন্দেহভাজন অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে সংগৃহীত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

অন্তত কয়েকজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে নির্বাচনের পরদিন গ্র্যান্ড জুরির সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে সমন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেরাই অপরাধের সন্দেহভাজন। তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁদের কাছে তথ্য ও নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।

এদিকে আদালত শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার বিষয়েই নয়, আরও বিস্তৃতভাবে নির্বাচনী তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নবম সার্কিট আদালতের আরেকটি সিদ্ধান্তে নয়টি অঙ্গরাজ্যে অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত কয়েকটি ফেডারেল তদন্ত নির্বাচনের দিন পর্যন্ত স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্যের ভোটার তালিকা চেয়েছে ওয়াশিংটন

রয়টার্সের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসির কাছ থেকেও ভোটারদের বিস্তারিত তালিকা চেয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

কেন্দ্রীয় সরকারের এসব পদক্ষেপে অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ন্যস্ত। কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনী আইন প্রয়োগ করতে পারলেও অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব নির্বাচনী ব্যবস্থায় তার হস্তক্ষেপের সীমা রয়েছে।

এ কারণেই ভোটার তালিকা, ব্যালট গণনা এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর ফেডারেল সরকারের চাপ প্রয়োগের বিষয়গুলো আদালতে গড়িয়েছে।

৪ কোটি ৯০ লাখের বেশি আগাম ভোট, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে লড়াই

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই অবস্থান ধরে রাখা ট্রাম্পের দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ অবশ্য আরও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে।

আলাস্কা, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যের ফল সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক তদন্তের সুযোগ পাবেন।

নির্বাচন নিয়ে আস্থা কতটা?

নির্বাচনী বিরোধ ও আইনি লড়াইয়ের মধ্যেও মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশ নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন।

রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন তাঁদের ভোট যথাযথভাবে গণনা করা হবে। মাত্র ১৫ শতাংশ ভোটার এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা বা অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। জরিপটি ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল।

এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ ভোটার এখনো ভোট গণনার নির্ভরযোগ্যতার ওপর আস্থা প্রকাশ করছেন।

শেষ মুহূর্তের প্রচারে ট্রাম্প

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। শুক্রবার ফ্লোরিডায় নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর সপ্তাহান্তে আইওয়া ও কানসাসে তাঁর প্রচার কর্মসূচি রয়েছে।

আগে এই দুই অঙ্গরাজ্যের সমাবেশ বাতিল করে টেলিফোনে প্রচারের পরিকল্পনা করা হলেও পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরাসরি সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরাও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রচার জোরদার করেছেন। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতি, অভিবাসন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

নির্বাচনের ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য, অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী স্বাধীনতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার সীমা।

নির্বাচনের আগে একের পর এক মামলা, তদন্ত ও আদালতের নির্দেশ মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

৩ নভেম্বরের ভোটে শেষ পর্যন্ত কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এবারের নির্বাচনে শুধু কে জিতবে, সেটিই নয়; নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা কতটা অটুট থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।