ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

আখেরী চার শোম্বা: ধর্মীয় আমল, নাকি লোকাচার?

আখেরী চার শোম্বা: ধর্মীয় আমল, নাকি লোকাচার?

ধর্ম ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ১২ আগস্ট:

ইসলামের নামে সমাজে এমন অনেক কিছু প্রচলিত আছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পালন হতে হতে একসময় মানুষের কাছে ধর্মীয় বিধানের মতোই মনে হয়। আখেরী চার শোম্বা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

সফর মাসের শেষ বুধবারকে উপমহাদেশের বহু মুসলমান বিশেষভাবে পালন করেন। কোথাও বিশেষ নামাজ পড়া হয়, কোথাও নফল রোজা রাখা হয়, কোথাও গোসল করে আনন্দ-উৎসব করা হয়। আবার কোথাও বিশ্বাস করা হয়, এ দিন নবী মুহাম্মদ (সা.) অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে বাইরে বের হয়েছিলেন এবং এ কারণে দিনটি বিশেষ বরকতময়।

প্রশ্ন হলো—কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে কি আখেরী চার শোম্বার এমন কোনো ধর্মীয় মর্যাদা আছে?

উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, দেখতে হবে দলিল।

সফর কি অশুভ মাস?

আখেরী চার শোম্বার নিয়ে আলোচনার আগে সফর মাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাটি পরিষ্কার করা জরুরি।

জাহেলি যুগের আরবদের মধ্যে সফর মাসকে অশুভ মনে করার প্রবণতা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন—

“সংক্রামক রোগের নিজস্ব ক্ষমতা নেই, অশুভ লক্ষণ নেই, হামাহ নেই এবং সফর নেই।”

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২২০a/২২২০d।

এখানে ‘সফর নেই’ কথাটির অর্থ সফর নামে কোনো মাস নেই—এমন নয়। বরং অধিকাংশ ব্যাখ্যায় এর অর্থ হলো, সফর মাসকে অশুভ বা বিপদের স্বতন্ত্র কারণ মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

অতএব, সফর মাস অশুভ—এ ধারণার ইসলামী ভিত্তি নেই।

তাহলে শেষ বুধবারের বিশেষত্ব কোথায়?

এখানেই মূল প্রশ্ন।

কুরআন বা সহিহ হাদিসে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ধর্মীয় দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। এ দিনের জন্য আলাদা কোনো নামাজ, নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোনো সূরা পাঠ, বিশেষ রোজা বা বিশেষ দোয়ার বিধানও নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না।

কিছু এলাকায় চার রাকাত বিশেষ নফল নামাজের প্রচলন রয়েছে। বলা হয়, প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সংখ্যায় সূরা পড়তে হবে এবং এর মাধ্যমে বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু এ ধরনের নামাজের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহয় কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির উদ্ধৃতি দিয়ে ইসলামিক ফতোয়া বিষয়ক একটি গবেষণামূলক সূত্রও জানায়, এ বিশেষ নামাজের কোনো ভিত্তি কুরআন বা সুন্নাহয় নেই।

এখানে একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার—সাধারণ ইবাদত আর নির্দিষ্ট দিনের জন্য নির্দিষ্ট ইবাদত এক জিনিস নয়।

নফল নামাজ পড়া ইবাদত। কোরআন পড়া ইবাদত। দান-সদকা করা ইবাদত। দোয়া করা ইবাদত।

কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার জন্য দলিল প্রয়োজন।

‘নবীজি সুস্থ হয়েছিলেন’—এই দাবি কতটা নির্ভরযোগ্য?

আখেরী চার শোম্বার প্রচলনের পেছনে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি শোনা যায় তা হলো—এই দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর অসুস্থতার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন এবং বাইরে বেরিয়েছিলেন।

কিন্তু কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে—এটি প্রমাণিত হলেও, সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট দিনকে ধর্মীয় উৎসব বা বিশেষ ইবাদতের দিন বানানোর অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কাজ করেছেন কি না, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন কি না—এসবের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাদিসই মূল মাপকাঠি।

তাই ‘নবীজি ওই দিন সুস্থ হয়েছিলেন’—এমন প্রচলিত বক্তব্যকে ভিত্তি করে আখেরী চার শোম্বার জন্য বিশেষ ইবাদত নির্ধারণ করা নিরাপদ নয়।

ভালো কাজ করলে সমস্যা কোথায়?

এখানে বিষয়টি একটু সূক্ষ্ম।

কেউ যদি আখেরী চার শোম্বার দিন সাধারণ নফল নামাজ পড়েন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, দোয়া করেন কিংবা গরিবকে দান করেন, তাহলে এসব নেক কাজ নিজের জায়গায় বৈধ। কারণ এগুলো করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বুধবারের প্রয়োজন নেই।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন বলা হয়—

“আজ আখেরী চার শোম্বা, তাই আজকের এই বিশেষ নামাজ পড়লে বিশেষ ফজিলত পাওয়া যাবে।”

অথবা,

“এই দিনের বিশেষ আমল করলে বছরের বিপদ-আপদ দূর হবে।”

এ ধরনের দাবির জন্য দলিল প্রয়োজন।

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে এমন কোনো ধর্মীয় বিধান প্রচার করা যাবে না, যার ভিত্তি নেই। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন করে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।

তাহলে আখেরী চার শোম্বা পালন করা উচিত কি না?

এ প্রশ্নের উত্তরও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

যদি ‘পালন’ বলতে বোঝানো হয়—এ দিনকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ ধর্মীয় দিবস মনে করে বিশেষ নামাজ, বিশেষ রোজা, বিশেষ দোয়া বা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান করা—তাহলে এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।

আর যদি কেউ দিনটিকে অন্য দিনের মতোই ধরে নিয়ে নফল ইবাদত করেন, কোরআন পড়েন, দান করেন বা দোয়া করেন—তাতে আপত্তির কারণ নেই। তবে সেই আমলকে আখেরী চার শোম্বার বিশেষ আমল হিসেবে প্রচার করা যাবে না।

ইসলাম কুসংস্কারমুক্ত একটি ধর্ম। কোনো মাস, দিন, তারিখ বা ঘটনাকে অশুভ কিংবা বিশেষ বরকতময় ঘোষণা করার আগে মুসলমানের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—এর দলিল কোথায়?

আখেরী চার শোম্বার ক্ষেত্রে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহয় এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা এটিকে মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

তাই এ দিনকে ঘিরে ভয়, অশুভের ধারণা কিংবা মনগড়া বিশেষ ইবাদতের পরিবর্তে একজন মুসলমানের জন্য উত্তম হলো—সফর মাসকে স্বাভাবিক একটি মাস হিসেবে দেখা এবং প্রতিদিনের মতোই ফরজ-ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি নফল ইবাদত করা।

ধর্মকে ভালোবাসার অর্থ শুধু ধর্মীয় আবেগকে অনুসরণ করা নয়; বরং যা সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে এসেছে, সেটিকে গ্রহণ করা এবং যা প্রমাণিত নয়, সেটিকে ধর্মের নামে প্রচার না করা।

সুতরাং আখেরী চার শোম্বা ইসলামের কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা প্রমাণিত সুন্নত নয়; এটি মূলত উপমহাদেশে প্রচলিত একটি ধর্মীয় লোকাচার। সফর মাসকে অশুভ মনে করা যেমন ইসলামসম্মত নয়, তেমনি এর শেষ বুধবারকে বিশেষ পুণ্যময় দিন মনে করারও নির্ভরযোগ্য শরিয়তি ভিত্তি নেই।

রেফারেন্স

১. সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হাদিস ২২২০a ও ২২২০d—সফরকে অশুভ মনে করার ধারণা প্রত্যাখ্যান।

২. সহিহ মুসলিম, Book of Greetings, Chapter 33—‘Adwa, Tiyarah ও Safar সম্পর্কিত বর্ণনা।

৩. Islam Question & Answer, “What’s So Special about the Month of Safar?”—সফরের শেষ বুধবারের বিশেষ নামাজের শরিয়তি ভিত্তি না থাকার বিষয়ে আলেমদের মতামত ও ফতোয়া।