“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭২।। গণপ্রজাতন্ত্রী দেশে ঘন ঘন গণপিটুনিতে গণমানুষের গণঅসন্তোষ!

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭২।। গণপ্রজাতন্ত্রী দেশে ঘন ঘন গণপিটুনিতে গণমানুষের গণঅসন্তোষ!

উৎসর্গ

গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো গণমানুষের স্মৃতির প্রতি—

যাঁদের অনেকেই বিচার পাওয়ার আগেই গণহাতে প্রাণ হারিয়েছেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রে রয়েছে জনগণের গণঅধিকার, গণনিরাপত্তা ও গণবিচারের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই বাংলাদেশেই গণপিটুনির ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। গুজব, গুঞ্জন, অভিযোগ, গোড়ার সত্য যাচাই না করা কিংবা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত গরজ—বিভিন্ন কারণে গণজমায়েত মুহূর্তে গণউন্মাদনায় রূপ নিচ্ছে। গণমানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে একজন মানুষের বাঁচার অধিকার। গণবিচারের নামে গড়ে উঠছে গণআদালত, আর গণরোষের পরিণতিতে ঘটছে গণহত্যার মতো নির্মমতা। প্রশ্ন হচ্ছে, গণতন্ত্রের দেশে গণমানুষের নিরাপত্তা কোথায়? গণপ্রজাতন্ত্রে জনগণের হাতে কি তবে বিচারকের হাতুড়ি ও জল্লাদের দড়ি তুলে দেওয়া হচ্ছে?

বাংলাদেশে গণপিটুনির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা অপহরণের সন্দেহ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ—কখনো আবার নিছক গুজব বা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করেও মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, অপরাধ দমনের নামে এই হত্যার সংস্কৃতি কোথা থেকে আসছে? আর রাষ্ট্রই বা কেন তা নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারছে না?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ৫১ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে। ২০২৫ সালে নিহত হন ১৯৮ জন। আর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৭১। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ৩৯৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ৫৩৭টি গণপিটুনির ঘটনায় ২৫৬ জন নিহত এবং ৫৭৫ জন আহত হয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে এ ধরনের ঘটনা ছিল ৪২৮টি এবং ২০২৪ সালে ১৬৯টি। আবার ১১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ১৬ দিনে ৯টি ঘটনায় ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। আরেকটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, মাত্র ১০ দিনে সাতটি ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যানের সময়সীমা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও ঘটনার সংজ্ঞা এক নয়। তাই এগুলো যোগ করে মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না। সরকারি হিসাবেও ভিন্ন চিত্র রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ১০৭টি ঘটনায় ৬৩ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হন। ২০২৬ সালের একই সময়ে ৬৩টি ঘটনায় নিহত হন ৪০ জন এবং আহত হন ৬৫ জন।

অর্থাৎ, সরকারি হিসাবে ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। কোন ঘটনাকে গণপিটুনি হিসেবে গণনা করা হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি কী এবং সব ঘটনা পুলিশের নথিতে আসছে কি না—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন।

আসকের হিসাবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহত ১৭১ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৩, চট্টগ্রামে ৩৯, খুলনায় ২২, রাজশাহীতে ১৮, ময়মনসিংহে ১২, বরিশালে ১১ এবং রংপুরে ছয়জন। অর্থাৎ রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এই সহিংসতার বিস্তার ঘটেছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। রংপুরের মিঠাপুকুরে চুরির সন্দেহে ২৫ বছর বয়সী খালিদ হাসানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই সকালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে রিকশার গ্যারেজে চুরির অভিযোগে প্রাণ গেছে ৩০ বছর বয়সী হাসানের। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির সন্দেহে এজারুল হক ও সাদিকুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও চুরির অভিযোগে আল আমিন নিহত হন।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায় শিশু চুরির সন্দেহে আলম শেখকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ভোলায় রাজনৈতিক নেতাকে ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর আসিফ নামে এক তরুণ গণপিটুনিতে নিহত হন। নোয়াখালীতে পারিবারিক বিরোধের অভিযোগে এক ব্যক্তি ও তাঁর দুই স্ত্রীকে জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, গণপিটুনি শুধু চুরির সন্দেহে সীমাবদ্ধ নেই; সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিরোধেও জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

ধর্মীয় অভিযোগও কখনো সহিংসতার অজুহাত হয়ে উঠছে। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে কয়েক দফা মারধরের পর হত্যা করা হয়। অভিযোগ সত্য কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, আগে চুরি বা পকেটমারের অভিযোগে গণপিটুনির ঘটনা বেশি দেখা যেত। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি, বাড়ি, বালুমহাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয় দখলের মতো স্বার্থ। ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা কাউকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেও জনতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মীয় অনুভূতিকেও কখনো এসব কাজে হাতিয়ার করা হচ্ছে।

এখানেই গণপিটুনি আর পরিকল্পিত মব সন্ত্রাসের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সব ঘটনা যে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে ঘটছে, তা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুজব ছড়ানো, কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং পরে জনতাকে উসকে দেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য থাকতে পারে। জমি বা ব্যবসা দখলের মতো স্বার্থে গণপিটুনি ব্যবহার করা হলে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সংগঠিত অপরাধেরও রূপ।

তাহলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কেন? গণপিটুনিতে অনেক মানুষ অংশ নিলে প্রত্যেকের ভূমিকা শনাক্ত করা কঠিন হয়। তদন্ত ও বিচার দীর্ঘায়িত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হয়। জনতার ভিড়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতাও বাড়ে।

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুনের বক্তব্য, মব সংস্কৃতি কখনোই আইনসম্মত নয়। অপরাধের বিচার চাইতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেমন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও আইন মেনে চলতে হবে।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কোনো অভিযোগ উঠলেই পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জনতার হাত থেকে নিরাপদে উদ্ধার করতে হবে। গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী, উসকানিদাতা এবং পরিকল্পনাকারী—সবার ভূমিকা তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু মামলা করলেই হবে না, বিচারও দৃশ্যমান হতে হবে।

নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই মব সহিংসতা বন্ধ হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা মানুষ পাচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দলীয় প্রভাব কিংবা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা যদি এসব ঘটনায় প্রশ্রয় দেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এবং অপরাধের দ্রুত বিচারই পারে জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ অপরাধ থেকে নিরাপত্তা চায়, আবার গণপিটুনি থেকেও নিরাপত্তা চায়। একজন মানুষ অপরাধী কি না, তা নির্ধারণ করবে আদালত—উত্তেজিত জনতা নয়। অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে হত্যা করা কোনো বিচার নয়; এটি আরেকটি অপরাধ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি জনতার সংখ্যায় নয়, আইনের শাসনে। গণঅধিকার রক্ষা করতে গিয়ে গণহত্যার সংস্কৃতি চলতে পারে না। গুজবের গণজোয়ার, প্রতিশোধের গণউন্মাদনা কিংবা দখলের গণসন্ত্রাস—কোনোটিই গণতন্ত্রের অংশ নয়।

প্রশ্ন তাই থেকেই যায়: যে দেশে জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক, সেই দেশে জনগণের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? গণপিটুনির শিকার মানুষ কি বিচার পাওয়ার আগেই মৃত্যুদণ্ড পাবে? আর রাষ্ট্র কি কেবল পরিসংখ্যান গুনবে, নাকি গণমানুষের জীবন রক্ষায় সত্যিকার অর্থে দায়িত্ব নেবে?

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১ নভেম্বর, ২০২৬