ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

খেলাপি ঋণে বিশ্বসেরা বাংলাদেশ, ১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই অনাদায়ী

খেলাপি ঋণে বিশ্বসেরা বাংলাদেশ, ১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই অনাদায়ী

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৫ সেপ্টেম্বর:

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তুলনায় দেশের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা ফেরত আসছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এর পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা। চাদের খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনির ৩০ শতাংশ, আলজেরিয়ার ২০ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ঘানার ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ।

তবে আন্তর্জাতিক তুলনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দেশগুলোর তথ্য অনেক ক্ষেত্রে আগের বছরের। বিপরীতে বাংলাদেশের হিসাব ২০২৬ সালের জুনের। ফলে সময়ের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই এই তুলনা করতে হবে।

দুই বছরে প্রায় তিনগুণ

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত সাম্প্রতিক দুই বছরে। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে দুই বছরে এত বিপুল পরিমাণ নতুন ঋণ খেলাপি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে পুনঃ তফসিল, বিশেষ সুবিধা ও বিভিন্ন হিসাবগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত দেখানোর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি আড়ালে ছিল। পরে ঋণের মান যাচাই ও শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়ায় সেই লুকানো ঝুঁকির বড় অংশ প্রকাশ্যে এসেছে।

ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের তথ্যও সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার কারণে অনেক ব্যাংক এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে। আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি।

ইউক্রেন কমিয়েছে, বাংলাদেশে বেড়েছে

কয়েক বছর আগেও সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের দেশ হিসেবে আলোচনায় ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতে দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল।

কিন্তু পরে ইউক্রেন পরিস্থিতি সামাল দিতে ঋণ পুনর্গঠন, আদায় এবং ব্যাংকের হিসাব থেকে পুরোনো সম্পূর্ণ সঞ্চিতি রাখা খেলাপি ঋণ অবলোপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বড় অঙ্কের পুরোনো খেলাপি ঋণ হিসাব থেকে সরানোর পর দেশটির খেলাপি ঋণের অনুপাত দ্রুত কমে যায়।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ যে দেশটি একসময় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের তালিকার শীর্ষে ছিল, এখন তার হার বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি।

তবে অবলোপন মানে ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। ব্যাংকের হিসাব থেকে ঋণ সরিয়ে নেওয়া হলেও পাওনা আদায়ের অধিকার বহাল থাকে।

শুধু কাগজে কমালে সমস্যার সমাধান হবে না

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়ম কঠোর করেছে। দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করা হচ্ছে, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব পদক্ষেপে আগে নিয়মিত দেখানো অনেক ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে সামনে এসেছে। ফলে স্বল্প মেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অন্যদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃ তফসিল ও অবলোপনের সুযোগ থাকলেও এতে কাগজে-কলমে অনুপাত কমলেও ব্যাংকের টাকা বাস্তবে ফেরত নাও আসতে পারে। তাই শুধু হিসাবের খাতা পরিষ্কার করলেই সংকট কাটবে না।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রুত ঋণ আদায়, মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো এবং ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন করে যাতে খারাপ ঋণ তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা করা। কারণ পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায় না করে শুধু নতুন করে পুনঃ তফসিল করা হলে সমস্যাটি সাময়িকভাবে আড়াল হতে পারে, কিন্তু ব্যাংক খাতের ভিত দুর্বলই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এখন তাই শুধু খেলাপি ঋণের অঙ্কই বড় প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো—ব্যাংকগুলো যে টাকা জনগণের আমানত থেকে ঋণ হিসেবে দিয়েছে, সেই টাকা কতটা নিরাপদে ফেরত আনা সম্ভব হবে।