বাংলাদেশ সংবাদ

দুর্যোগ দরজায়, ঢাকা–চট্টগ্রাম–সিলেট কতটা প্রস্তুত?

দুর্যোগ দরজায়, ঢাকা–চট্টগ্রাম–সিলেট কতটা প্রস্তুত?

ভয়েস অব পিপল বিশেষ প্রতিবেদন:

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—দুর্যোগের আগে প্রস্তুতির ঘাটতি একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কত দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস কিংবা ভূমিকম্প—কোনোটিই বাংলাদেশের জন্য অপরিচিত নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশের ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণে দেশের কয়েকটি অঞ্চল এখন একাধিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট নিয়ে। তিন শহরের ঝুঁকির ধরন আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় মিল—বড় ধরনের দুর্যোগ আঘাত হানলে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জরুরি সেবা কতটা চাপ সামলাতে পারবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত করার মতো নয়।

বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক এবং আগাম সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থায় দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু দুর্যোগ মানেই কেবল ঘূর্ণিঝড় নয়। ভূমিকম্পের পর ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ কিংবা শিল্পদুর্ঘটনা—এসবের জন্য প্রস্তুতির প্রশ্নটি আরও কঠিন।

ঢাকা: ভূমিকম্পের পর কী হবে?

ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা শুধু ভবনের সংখ্যা নয়, বরং মানুষের ঘনত্ব ও অবকাঠামোর জটিলতা। শহরের বহু এলাকায় ভবনের সঙ্গে ভবনের দূরত্ব কম, রাস্তা সরু, কোথাও কোথাও জরুরি যান চলাচলের সুযোগ সীমিত। এর সঙ্গে রয়েছে পুরোনো ভবন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের ব্যবহার এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ।

একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিপদ কেবল ভবন ধসে থেমে থাকবে না। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ রাস্তা বন্ধ করতে পারে, গ্যাসলাইন বা বৈদ্যুতিক সংযোগে আগুন লাগতে পারে, হাসপাতাল রোগীর চাপে অচল হয়ে যেতে পারে। একই সময়ে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাস্তায় নামলে তৈরি হতে পারে আরেক ধরনের বিশৃঙ্খলা।

বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। প্রশ্ন হলো—ভূমিকম্পের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো কতটা চিহ্নিত ও নিরাপদ করা হয়েছে?

প্রতিটি ওয়ার্ডে জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ সমাবেশস্থল থাকা উচিত। বড় দুর্যোগের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি নষ্ট হতে পারে।

চট্টগ্রাম: এক শহরে একাধিক বিপদ

চট্টগ্রামের ঝুঁকি আরও বহুমাত্রিক। একদিকে ভূমিকম্পের আশঙ্কা, অন্যদিকে পাহাড়ধস। এর সঙ্গে রয়েছে বন্দর, শিল্পকারখানা, জ্বালানি অবকাঠামো, রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ পরিবহন এবং ঘনবসতি।

পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। অতিবৃষ্টি হলে দুর্বল পাহাড়ি ঢাল থেকে মাটি নেমে এসে মুহূর্তে সড়ক ও বসতি চাপা দিতে পারে। আর বড় ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে একটি বিপর্যয়ের সঙ্গে আরেকটি বিপর্যয় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখানে শুধু সতর্কবার্তা দিলেই হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও বসতি চিহ্নিত করে আগাম উচ্ছেদ পরিকল্পনা, বৃষ্টির পরিমাণ ও মাটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধার দল এবং দ্রুত যোগাযোগের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। একটি বড় দুর্ঘটনা শুধু মানুষের জীবন নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সিলেট: ভূমিকম্প ও আকস্মিক বন্যার দ্বৈত ঝুঁকি

সিলেটের পরিস্থিতিও কম উদ্বেগের নয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্পের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে অবস্থিত। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে।

সিলেটের জন্য তাই শুধু বন্যা মোকাবিলার পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভূমিকম্প, বন্যা ও ভূমিধসকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত দুর্যোগ পরিকল্পনা।

শহরের হাসপাতাল, স্কুল, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও পুরোনো ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ দুর্যোগের সময় হাসপাতাল যদি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমের বড় অংশ অচল হয়ে যেতে পারে।

সতর্কবার্তা আছে, কিন্তু মানুষ কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে কাজ হচ্ছে। মোবাইল ফোনে বার্তা, সাইরেন, রেডিও-টেলিভিশন, মসজিদের মাইক ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব। কিন্তু শুধু বার্তা পাঠানোই যথেষ্ট নয়।

মানুষকে জানতে হবে—বার্তা পাওয়ার পর কোথায় যেতে হবে, কোন পথ ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে।

প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল থাকা দরকার। তাদের শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; প্রয়োজন হবে নিয়মিত মহড়া। দুর্যোগের সময় ফায়ার সার্ভিস বা সেনাবাহিনী কখন পৌঁছাবে, তা অপেক্ষা করে বসে থাকার সুযোগ নেই। প্রথম কয়েক মিনিট ও ঘণ্টায় প্রতিবেশীকেই প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে? তাই বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা, জরুরি রেডিও এবং স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগের ব্যাকআপ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

হিমালয়ের পানি, বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশের আরেকটি বিশেষ দুর্বলতা তার ভৌগোলিক অবস্থান। দেশের বড় নদীগুলোর একটি অংশের পানির উৎস সীমান্তের ওপারে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, তুষার ও হিমবাহ গলন, ভূমিধস বা আকস্মিক নদীপ্রবাহের পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।

এ কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্যা ও নদীর তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান এখন কেবল কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নও। সময়মতো তথ্য পাওয়া গেলে কয়েক ঘণ্টা আগেই মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

দুর্যোগের পর নয়, প্রস্তুতি শুরু করতে হবে আগেই

সবচেয়ে বড় ভুল হবে দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর শুধু উদ্ধার ও ত্রাণের হিসাব করা। তখন অনেক কিছুই করার থাকে না। আসল প্রস্তুতি নিতে হয় বিপর্যয়ের আগে।

ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, চট্টগ্রামের পাহাড় ও শিল্পাঞ্চলকে আলাদা ঝুঁকি মানচিত্রে আনা, সিলেটে ভূমিকম্প ও আকস্মিক বন্যার সমন্বিত পরিকল্পনা করা—এসব এখনই করা সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই কাজটি যথেষ্ট দ্রুত করছি?

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরদেশের গল্প নয়। এটি একটি সতর্কসংকেত। দুর্যোগ কবে আসবে, আমরা জানি না। কিন্তু প্রস্তুতি কবে শুরু করতে হবে—সেটা জানার জন্য আর কোনো দুর্যোগের অপেক্ষা করা উচিত নয়।

প্রকৃতিকে থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃতির আঘাতকে মহাবিপর্যয়ে পরিণত হতে না দেওয়া—সেটি এখনো মানুষের হাতেই।