পশ্চিম তীরে ‘জাতিগত নিধন’ চলছে
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্রিটেনসহ ১২ দেশের কঠোরতম অবস্থান
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ সেপ্টেম্বর:
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ চলছে এবং এতে ইসরায়েলি সরকারের নীরব সমর্থন রয়েছে।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই অবস্থান ঘোষণা করে লন্ডন। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন ব্যবস্থায় অধিকৃত ভূখণ্ডের অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে। এসব বসতির নির্মাণকাজে সেবা দেওয়া, অর্থায়ন করা কিংবা বাণিজ্যিকভাবে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আসছে। যুক্তরাজ্যে অবৈধ বসতির সম্পত্তির বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারী সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হবে।
এ ছাড়া দখলদারিত্বকে সরাসরি সহায়তা করতে পারে—এমন অস্ত্রের লাইসেন্স ও অন্যান্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করবে ব্রিটেন।
মিলিব্যান্ড একই সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছেন। এতদিন যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে এলেও পশ্চিম তীরের পুরো দখলদারিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। এখন থেকে ব্রিটেন পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি দখলকে সামগ্রিকভাবেই বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করবে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, এতদিন ধরে যারা এই পরিস্থিতির শিকার, তাদের প্রতি ন্যায়বিচারের পথে এটি হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।
ইসরায়েলের পাল্টা পদক্ষেপ
ব্রিটেনের ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং অভিযোগ করেন, লন্ডন পরিকল্পিতভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
ইসরায়েল ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি গাজা-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সমন্বয় মিশনে ব্রিটেনের অংশগ্রহণও বন্ধ করার কথা জানিয়েছে দেশটি।
ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের বিপরীতে ফিলিস্তিনপন্থী ব্রিটিশ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেরেমি করবিন, জারা সুলতানা ও ডায়ান অ্যাবটসহ কয়েকজন ব্রিটিশ এমপিকে ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে তেল আবিব।

পশ্চিম তীরে নতুন উদ্বেগ
ব্রিটিশ সরকারের কঠোর অবস্থানের পেছনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক পরিকল্পনাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে জেরুজালেমের পূর্বদিকে E1 এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও ভূখণ্ডগত সংযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মিলিব্যান্ড বলেছেন, যারা অবৈধ বসতি নির্মাণে অর্থ জোগান বা সহায়তা করবে, তাদের ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে। নতুন আইন কার্যকর করতে প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে।
‘গণহত্যা’ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত অবস্থান নয়
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করলেও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে এখনো ‘গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি ব্রিটিশ সরকার।
মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকবে যুক্তরাজ্য। তার বক্তব্য, গণহত্যার অভিযোগের বিচার আন্তর্জাতিক আদালতের স্বাধীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্রিটেনের আরও আগেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
১২ দেশের একই পদক্ষেপ
যুক্তরাজ্য একা নয়। একই দিনে আরও ১১টি দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, পোল্যান্ড ও পর্তুগাল।
ফলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি প্রশ্নটি শুধু ব্রিটেন-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে উঠছে।
মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের জনগণের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক অটুট থাকবে। কিন্তু ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সেই সম্পর্ককে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
তার বক্তব্যের মূল বার্তা—ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারের প্রতি সমর্থন এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সমর্থন পরস্পরবিরোধী নয়।
ব্রিটেনের নতুন অবস্থানের লক্ষ্যও তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়; দুই রাষ্ট্রের সহাবস্থানভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার জন্য ইসরায়েলি দখলদারিত্বের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো।