ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধার অভিযান, আহত ৮৭; আরও কম্পনের আশঙ্কা
কলম্বিয়ায় শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ১১১
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১১ আগস্ট :
কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১ জনে। আহত হয়েছেন অন্তত ৮৭ জন। ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনও অনেকে আটকে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় রাতভর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু পর আঘাত হানা ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমারের কাছে। এলাকাটি তুলনামূলকভাবে দুর্গম ও জনবসতি কম হওয়ায় কেন্দ্রের আশপাশে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত থাকলেও কম্পনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায়।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কফি উৎপাদনের জন্য পরিচিত রিসারালদা প্রদেশে। প্রদেশটির রাজধানী পেরেইরা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে পড়েছে বহু ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামো। ক্যালি, মানিজালেস ও কিবদোর মতো শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
কলম্বিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৬১টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে সময় লাগছে। কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরও নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর অন্তত ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা সতর্ক অবস্থায় কাজ করছেন, কারণ পরবর্তী কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া ভবনগুলো আরও ধসে পড়তে পারে। কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাতের মধ্যেও মানুষের মধ্যে দেখা গেছে বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে উদ্ধারকর্মীরা জীবিত কাউকে খুঁজছেন, আর কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষও হাতে হাত লাগিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে যোগ দিয়েছেন।
ক্যালির এক নারী স্থানীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের আগে তাঁর ফোনে গুগলের সতর্কবার্তা আসায় তাঁরা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাঁর ভাষ্য, সবাই এমন সতর্কতা পাওয়ার সুযোগ পাননি; অনেকেই ভবনের ভেতরেই আটকা পড়েছেন।
ভূমিকম্পটির মাত্রা ও গভীরতা নিয়েও শুরুতে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও পরে কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ এটিকে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার বলে নিশ্চিত করে। এটি ২১ শতকে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ছিল তুলনামূলক গভীরে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এত গভীরে উৎপন্ন কম্পনে ভূপৃষ্ঠে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের কম্পনের শক্তি, ভূগর্ভস্থ গঠন এবং কিছু এলাকায় নরম মাটির কারণে কাঁপুনির প্রভাব অনেক বেশি হয়েছে।
কলম্বিয়া এমনিতেই ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটির পশ্চিমাঞ্চল প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূকম্পন বলয়ের প্রভাবে নিয়মিত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভব করে। তবে এবারের ঘটনা তার ভয়াবহতা ও প্রাণহানির কারণে বিশেষভাবে নজিরবিহীন হয়ে উঠেছে।
প্রায় তিন দশক আগেও এই কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল ভয়াবহ ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে আর্মেনিয়া ও পেরেইরা অঞ্চলে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
এবারের দুর্যোগের আরেকটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটিকে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলোকে পূর্ণ শক্তি নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আছেন কি না—এই আশাতেই ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাত জেগে অপেক্ষা করছেন। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পর হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।