‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩০।। সুখের আশায়

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩০।। সুখের আশায়

সুখের আশায়

উৎসর্গ

সুখের আশায় যাঁরা দূরদেশে পাড়ি দেন—
সকল প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়

মানুষ কখনো কখনো সুখের জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকেই দূরে পাঠিয়ে দেয়।

নওগাঁর গন্ডগোহালি গ্রামের গুফফার প্রামাণিকও পাঠিয়েছিলেন।

দুই ছেলে মহন আর সুমনকে।

ভাবেননি, একদিন সেই দুই ছেলেকেই ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে—জীবিত নয়, কফিনে।

সেদিন সকাল থেকে গুফফারের বাড়িতে মানুষের ভিড়।

কেউ কথা বলছে নিচু গলায়। কেউ কাঁদছে। কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

ঘরের এক কোণে বসে গুফফার দুই ছেলের ছবি হাতে নিয়ে আছেন।

ছবিতে মহন হাসছে।

পাশে সুমন।

দুই ভাই পাশাপাশি।

যেন এখনই উঠে বলবে—

‘বাপ, আমরা আইছি।’

কিন্তু তারা আর আসবে না।

মহন সাত বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিল।

বাড়ির জমি বন্ধক রেখে জোগাড় করা হয়েছিল পাঁচ লাখ টাকা।

মহন তখন বাবাকে বলেছিল,

—বাপ, আর কষ্ট করুম না। দুই-চার বছর কাম কইরা টাকা পাঠামু। জমি ছাড়ামু। তারপর ঘর করমু।

বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,

—তুই ভালো থাকলেই হইব বাবা।

মহন হেসেছিল।

সে জানত না, তার বাবা ‘ভালো থাকা’ বলতে কী বোঝেন।

মা জানতেন।

মায়ের কাছে ভালো থাকা মানে ছিল—ছেলে দূরে থাকলেও প্রতিদিন ফোন করবে।

‘মা, খাইছ?’

এই একটি প্রশ্নেই মায়ের দিন কেটে যেত।

দুই বছর পর ছোট ভাই সুমনও গেল

ভাইয়ের কাছে।

একই দেশে।

একই কারখানায়।

দুই ভাই একসঙ্গে কাজ করত।

মাঝে মাঝে ফোন করে বলত,

—মা, চিন্তা কইরো না। আর বেশি দিন না।

মা জিজ্ঞেস করতেন,

—কবে আসবি?

মহন বলত,

—আগে বাড়িটা করি।

সুমন হাসত।

—তারপর বিয়া করমু।

মা বলতেন,

—বিয়া আগে করবি, না ঘর আগে?

ওপাশে দুই ভাইয়ের হাসি শোনা যেত।

সেই হাসিই ছিল মায়ের সংসারের সবচেয়ে দামি শব্দ।

ময়না খাতুনের বাড়িতেও তখন একই স্বপ্ন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন,

‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি।’

একটু থামেন তিনি।

চোখের পানি আঁচলে মুছতে গিয়ে আরও কেঁদে ফেলেন।

‘ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বিয়া করমু মা।’

মায়ের কণ্ঠে তখনও যেন ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটা বেঁচে আছে।

‘মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু।’

তারপর হঠাৎ তাঁর গলা ভেঙে যায়।

‘কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’

মায়ের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

যে ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার কথা ছিল, এখন তাঁরই শেষ মুখ দেখার অপেক্ষায় মা।

অন্য একটি বাড়িতে শোকের রং আরও গাঢ়।

রুবেল প্রামাণিক।

নয় বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।

সাড়ে ছয় বছর পর একবার ছুটিতে দেশে ফিরেছিলেন।

তখন বাড়িতে উৎসব।

ছেলে এসেছে।

বিয়ে হবে।

বিয়েও হলো।

রুবেল আবার সৌদি আরবে ফিরে গেলেন।

তারপর তাঁদের ঘর আলো করে এলো একটি কন্যাসন্তান।

মেয়েটি বাবাকে হয়তো ঠিকমতো চিনতেও শেখেনি।

ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে আবার কর্মস্থলে ফিরেছিলেন রুবেল।

তারপর?

আরও একটি সন্তান এলো পৃথিবীতে।

বাবার জন্য অপেক্ষা না করেই।

শিশুটির বয়স এখন মাত্র ১৪ দিন।

রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বসে আছেন সেই শিশুটির দিকে তাকিয়ে।

কোলের ছোট্ট মানুষটি কিছুই জানে না।

জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকবে না।

জানে না, তার জন্য কেনা জামাটি হয়তো আর বাবার হাতে পরানো হবে না।

সাইদুর বলেন,

‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেলো সৌদি।’

তিনি একটু থামেন।

চোখ মুছেন।

‘যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো।’

কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।

‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকলো না বাবা।’

তারপর তিনি শিশুটির দিকে তাকান।

‘আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’

কথাটা বলেই তিনি মুখ ঢেকে ফেলেন।

চোখের সামনে ১৪ দিনের শিশুটি।

আর মনের ভেতর নয় বছর ধরে বিদেশে থাকা ছেলেটির মুখ।

সৌদি আরবের সেই কারখানায় তখন আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

নওগাঁর এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে খবর যাচ্ছে।

কেউ ফোন করছে।

কেউ ফোন ধরছে না।

কেউ বিশ্বাস করছে না।

কেউ আবার বিশ্বাস করে ফেলেও চুপ করে আছে।

একজন এসে বলল,

—কারখানায় ১৬ জন বাংলাদেশি মারা গেছে।

বাতাস যেন থেমে গেল।

গুফফার প্রামাণিকের হাত কাঁপতে লাগল।

তিনি দুই ছেলের ছবি আরও শক্ত করে ধরে বললেন,

—আমার মহন?

কেউ উত্তর দিল না।

—সুমন?

তবুও কেউ কিছু বলল না।

নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে দাঁড়াল।

গুফফার ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়লেন।

ছবির দুই ছেলের হাসিমুখ তাঁর চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল।

তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন শেষ ফোনের কথা।

মহন বলেছিল—

‘বাপ, ঘরটা শেষ করমু।’

সুমন বলেছিল—

‘মায়ের জন্য শাড়ি আনমু।’

বাবা তখন বুঝতে পারেননি, ছেলেদের কথাগুলো আসলে বিদায়ের কথা হয়ে থাকবে।

বাইরে তখন মানুষ জমেছে।

কেউ সান্ত্বনা দিতে এসেছে।

কেউ খবর নিতে।

কেউ শুধু দাঁড়িয়ে আছে।

মা ঘরের ভেতর থেকে বারবার চিৎকার করছেন—

‘মহন... সুমন...’

গুফফার কোনো কথা বলছেন না।

তিনি শুধু দুই ছেলের ছবি দেখছেন।

পাঁচ লাখ টাকা।

সাত লাখ টাকা।

বন্ধক রাখা জমি।

বিদেশে পাঠানোর খরচ।

বাড়ি করার স্বপ্ন।

বিয়ের স্বপ্ন।

মায়ের শাড়ি।

বাবার ওষুধ।

সবকিছু যেন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেছে।

তিনি ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁপা হাতে আঙুল বুলিয়ে দিলেন।

তারপর বুকের মধ্যে দুই ছেলের ছবি চেপে ধরে হাউমাউ করে উঠলেন—

‘সুখের আশায় পোলাগুলাক বিদেশ পাঠাইছিলাম রে... দেশত থাকলে কষ্ট হইত, না খাইয়া থাকত, তবু তো আমার চোখের সামনে জীবত থাকত! হামার ঘর পাকা হইল না—কিন্তু হামার বুকটা খালি কইরা দিয়া গেলি কেন বাবা? আল্লাহ... সুখ চাইছিলাম, পোলা হারানোর এই সুখ কেডা দিল হামারে!’

লন্ডন, ১১ আগস্ট