বাংলাদেশি তরুণদের নিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা ও মানবপাচারের অভিযোগ

চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে রাশিয়ায়, তারপর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে

চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে রাশিয়ায়, তারপর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১২ সেপ্টেম্বর :

রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন এবং ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব পাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের একটি অংশকে এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হচ্ছে, যার প্রকৃত অর্থ তারা বুঝতে পারছেন না। এরপর তাদের পাঠানো হচ্ছে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত অনেককে দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর হয়ে লড়াই করতে।

কেউ ফিরে এসেছেন আহত অবস্থায়। কেউ পালিয়ে বাঁচতে পেরেছেন। কেউ যুদ্ধবন্দি। আবার কারও পরিবারের কাছে এসেছে মৃত্যুর খবর। বহু পরিবারের কাছে এখনো কোনো খবরই নেই।

এটি নিছক বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন এই কর্মকাণ্ডকে মানবপাচার ও জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগের সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে দেখছে।

অ্যামনেস্টির সর্বশেষ তদন্ত

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, রাশিয়া বিদেশি নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করতে প্রতারণা, চাপ প্রয়োগ এবং শোষণমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করছে। অনেককে বেসামরিক চাকরি, উচ্চ বেতন, বৈধ বসবাসের সুযোগ কিংবা রুশ নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আকৃষ্ট করা হয়। পরে তাদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

অ্যামনেস্টির গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক বিদেশি নাগরিক এমন নথিতে স্বাক্ষর করেছেন যা তারা পড়তে বা বুঝতে পারেননি। সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর তাদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অনেককে মাত্র প্রায় দুই সপ্তাহের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।

অ্যামনেস্টির মতে, এ ধরনের প্রতারণা, জবরদস্তি এবং মানুষের দুর্বল আর্থিক অবস্থাকে কাজে লাগানোর পদ্ধতি জাতিসংঘের পালের্মো প্রোটোকলের আওতায় মানবপাচারের সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের তরুণরাও এই নেটওয়ার্কের শিকার

বাংলাদেশিদের নিয়ে মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত ৬২ পৃষ্ঠার একটি পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস জানিয়েছে, বাংলাদেশি পুরুষদের অনেককে বেসামরিক চাকরির মিথ্যা প্রস্তাব দিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছে। পরে তাদের রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনা পাওয়া গেছে।

সংস্থাগুলো মে ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ইউক্রেনে ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রুশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশি, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তি, নিহতদের স্বজন, মানবপাচারবিরোধী কর্মী এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।

তদন্তে উঠে এসেছে, দালালরা বাংলাদেশিদের সাধারণত ক্লিনার, বাবুর্চি, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার কিংবা কারখানার কর্মী হিসেবে চাকরির প্রস্তাব দিত। কারও কাছে মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলার পর্যন্ত বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

‘চাকরির কাগজ’ আসলে ছিল সামরিক চুক্তি

বাংলাদেশি নাগরিক মাকসুদুর রহমানের ঘটনা এই প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

এপি’র অনুসন্ধান অনুযায়ী, তাঁকে রাশিয়ায় ক্লিনারের চাকরির কথা বলে নেওয়া হয়েছিল। এজন্য তাঁকে প্রায় ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছিল। মস্কো পৌঁছানোর পর তাঁকে রুশ ভাষায় একটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি মনে করেছিলেন এটি চাকরির চুক্তি।

পরে জানা যায়, সেটি ছিল সামরিক চুক্তি।

মাকসুদুরসহ কয়েকজন বাংলাদেশিকে সামরিক স্থাপনায় নিয়ে অস্ত্র চালানো, ড্রোন যুদ্ধ, আহত সৈন্য সরানোসহ বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তাঁদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

মাকসুদুর এপিকে জানান, প্রতিবাদ করার পর এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে তাঁকে বলেছিলেন—তাঁকে তাঁর এজেন্ট পাঠিয়েছে এবং তাঁদের জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছে।

এপি তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ভ্রমণ নথি, রুশ সামরিক চুক্তি, চিকিৎসা ও পুলিশ রিপোর্ট এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতির ছবি মিলিয়ে দেখেছে।

পালাতে চাইলেও রক্ষা নেই

আরেক বাংলাদেশি মোহন মিয়াজি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন গ্যাস-প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে। পরে তাঁকে রুশ বাহিনীতে যুক্ত করা হয়।

এপি’র অনুসন্ধান অনুযায়ী, তাঁকে ইউক্রেনের দখলকৃত আভদিভকা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, পালানোর বা আদেশ অমান্য করার চেষ্টা করলে তাঁকে মারধর করা হয়েছে, হাতকড়া পরানো হয়েছে এবং একটি ছোট কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ বহন এবং মৃতদেহ উদ্ধারের কাজও করতে হয়েছে।

ফোর্টিফাই রাইটসের তদন্তেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে—কিছু বাংলাদেশিকে অল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে, কেউ ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন, কেউ কমান্ডারের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন এবং কেউ বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কারও পাসপোর্টও আটকে রাখা হয়েছে।

মৃত্যুর সংখ্যা কত?

এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই।

এপি’র অনুসন্ধানে বাংলাদেশের একজন তদন্তকারী বলেছেন, এই ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারেন। তবে এটি চূড়ান্ত সরকারি সংখ্যা নয় এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বা কম হতে পারে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি পৃথক অনুসন্ধানে আরও একটি ভয়াবহ ঘটনা সামনে আসে। ৩০ বাংলাদেশি তরুণ বৈধ কাজের ভিসা ও জনশক্তি ছাড়পত্র নিয়ে রাশিয়া যাওয়ার পর তাঁদের অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং দুজন নিখোঁজ ছিলেন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সংসদে জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর ওই শ্রমিকদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল।

বাংলাদেশের মস্কো দূতাবাসও বিষয়টি নিয়ে আগেই সতর্ক হয়েছিল। দূতাবাসের প্রতিবেদনে নথিপত্রে অসঙ্গতি পাওয়ার কথা বলা হয়। রুশ কোম্পানি ও নিয়োগকারী সংস্থা আশ্বস্ত করেছিল যে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না। কিন্তু পরে একজন পরিবারের সদস্য দূতাবাসকে জানান, শ্রমিকদের ডনেস্কের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রাখা হয়েছে, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

দূতাবাস এরপর রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তদন্ত ও জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়।

৩০ জনের ঘটনায় চারজনের মৃত্যু

এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ নয়, বাংলাদেশের সংসদে দেওয়া সরকারি বক্তব্য এবং মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের নথিও রয়েছে।

৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার জন্য গিয়েছিলেন। তাঁদের পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশি একটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। দূতাবাসের শ্রম উইং ওই নিয়োগের কিছু নথিতে ভুল ও অসঙ্গতি পেয়েছিল এবং প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছিল।

এরপরও শ্রমিকরা রাশিয়া যান।

কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ আসে।

পরিণতিতে চারজন মারা যান।

দুজন পালিয়ে ডনেস্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করেন। পরে তাঁদের রুশ কমান্ডার আটক করে নিয়ে যায়। তাঁদের জীবিত না মৃত—সে সময় পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাংলাদেশিদের একা নয়

এটি শুধু বাংলাদেশিদের ঘটনা নয়।

২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে মোট ১,৯২৩ জনকে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। একই তথ্যভান্ডারে অন্তত ৪৫৫ জন দক্ষিণ এশীয় নাগরিকের নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এই তথ্য ইউক্রেনের যুদ্ধবন্দিদের বিষয়ক সমন্বয় সদর দপ্তর এবং রুশ সামরিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

অর্থাৎ রাশিয়ার বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগ এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি যুদ্ধের জনবল সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে আসছে।

কেন বাংলাদেশি তরুণরা টার্গেট?

বাংলাদেশের বাস্তবতা এই প্রশ্নের উত্তরও দেয়।

দেশে পর্যাপ্ত ভালো চাকরির অভাব, বিদেশে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং দ্রুত বেশি অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন—এসবকে কাজে লাগায় দালালচক্র।

অনেক পরিবার বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয় অথবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে। ফোর্টিফাই রাইটসের অনুসন্ধানে এমন পরিবার পাওয়া গেছে যারা সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করার পর শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে।

আর একটি বড় সমস্যা ভাষা।

অনেক বাংলাদেশি রুশ ভাষা পড়তে পারেন না। ফলে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে নিয়োগকেন্দ্র পর্যন্ত তাঁরা দালালের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। চাকরির কাগজ মনে করে যে নথিতে স্বাক্ষর করছেন, সেটি যে সামরিক চুক্তি—তা বুঝতেই পারেন না।

প্রশ্ন বাংলাদেশেরও

এই ঘটনায় শুধু রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

বাংলাদেশ থেকে যেসব নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও দালাল তরুণদের পাঠাচ্ছে, তাদের ভূমিকা নিয়েও কঠোর তদন্ত প্রয়োজন।

প্রশ্ন হলো—যে তরুণকে ক্লিনার, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা কারখানার শ্রমিক হিসেবে পাঠানো হচ্ছে, সে কীভাবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে পৌঁছে যাচ্ছে?

কোন প্রতিষ্ঠান তার কাগজপত্র যাচাই করেছে?

কী ধরনের ভিসা দেওয়া হয়েছে?

বাংলাদেশের জনশক্তি ছাড়পত্র দেওয়ার আগে নিয়োগকর্তার কার্যক্রম কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে?

দূতাবাস সন্দেহ প্রকাশ করার পরও কেন শ্রমিকরা রাশিয়া যেতে পেরেছেন?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশি নাগরিককে বিদেশে চাকরির নামে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে?

এপি’র অনুসন্ধানে বাংলাদেশের পুলিশ এমন একটি পাচার নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে এবং একজন রুশ নাগরিকত্বধারী বাংলাদেশি মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে

১০ সেপ্টেম্বরের অ্যামনেস্টি প্রতিবেদন এই ঘটনাকে আরও বড় মাত্রায় নিয়ে গেছে।

অ্যামনেস্টি বলছে, বিদেশিদের রুশ বাহিনীতে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণা, জবরদস্তি, অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং পরে চলাফেরায় বাধা দেওয়ার যে ধারাবাহিকতা তারা দেখেছে, তা অনেক ক্ষেত্রে মানবপাচারের পর্যায়ে পড়ে।

সংস্থাটি বলেছে, এই নিয়োগব্যবস্থায় বিদেশিদের শুধু যুদ্ধের জন্য নিয়োগ করাই নয়, তাঁদের ঝুঁকি সম্পর্কে বিভ্রান্ত করা এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এখানেই বিষয়টি সাধারণ শ্রমিক প্রতারণা থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের মুনাফা, কিন্তু মূল্য দিচ্ছে দরিদ্র পরিবার

রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের মাটিতে প্রতিদিন সৈন্য দরকার। রাশিয়ার জন্য বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ সেই জনবল চাহিদার একটি অংশ পূরণ করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে এসেছে।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে যাদের পাঠানো হচ্ছে, তাদের অনেকের যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তই ছিল না।

তারা গিয়েছিল চাকরি করতে।

কেউ গিয়েছিল পরিবারের ঋণ শোধ করতে।

কেউ গিয়েছিল সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলাতে।

কেউ গিয়েছিল মাসে এক হাজার ডলার আয় করার আশায়।

শেষ পর্যন্ত কারও হাতে উঠেছে বন্দুক, কারও হাতে মৃতদেহ বহনের দায়িত্ব, কারও শরীরে গুলির ক্ষত—আর কারও পরিবার পেয়েছে শুধু মৃত্যুসংবাদ।

সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, কিছু পরিবার এখনও জানে না তাদের ছেলে বা স্বামী বেঁচে আছেন কি না।

চাকরির নামে কাউকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো কোনো স্বাভাবিক অভিবাসন নয়। এটি প্রতারণা, শোষণ ও মানবাধিকারের গুরুতর প্রশ্ন।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন শুধু নিহতদের তালিকা করা নয়। প্রয়োজন—রাশিয়ায় যাওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশির অবস্থান শনাক্ত করা, নিখোঁজদের উদ্ধারে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা, মৃতদের মরদেহ দেশে ফেরানো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং এই আন্তর্জাতিক নিয়োগচক্রের বাংলাদেশি অংশটি ভেঙে ফেলা।

আর রাশিয়ায় চাকরির নামে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি তরুণ যেন যুদ্ধক্ষেত্রে না পৌঁছায়—এ জন্য সরকারকে তাৎক্ষণিক ও প্রকাশ্য সতর্কতা জারি করা জরুরি।