মানুষের ভাষা এবং বাংলার একুশ ।। গোলাম কবির

মানুষের ভাষা এবং বাংলার একুশ ।। গোলাম কবির

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন দেখে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে একটা ইতিহাস জানতে পারলাম।
তা হলো কুখ্যাত "মিউনিখ চুক্তি'' (Munich Pact)।  এই তোষন নীতির চুক্তিতে হিটলার সুদেতান নামক চেকশ্লোভাকিয়ার জার্মান সীমান্তের একটি অঞ্চল তার হস্তগত করেছিলো বটে, কিন্তু সেটি ছিলো জার্মানভাষী মানুষদেরই অঞ্চল!

১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মিউনিখে স্বাক্ষরিত একটি কুখ্যাত চুক্তি, যেটা হয়েছিলো এডলফ হিটলারের ঘৃণ্য আবদারে!

তৎকালীন চেকশ্লোভাকিয়ার একটি অঞ্চল জার্মান সীমান্তে ছিলো যার নাম সুদেতানল্যান্ড। সেই অঞ্চলটির মানুষ জার্মানভাষী। তাই হিটলার আবদার করলো অঞ্চলটি জার্মানকে দিতে হবে! ফ্রাঞ্চ এবং ব্রিটেন হিটলারের আবদারে তাকে তোষণ করার নিমিত্তে চুক্তি করতে রাজি হয়ে গেলো! তাই এই চুক্তিকে Appeasement চুক্তি অর্থাৎ তোষণ নীতির চুক্তি বলা হয়।

হিটলার তখন এক মনুষ্য রুপি মুর্তিমান দানবের নাম। সেক্ষেত্রে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ছিলো আতংকে। সেদিক থেকে ঐ তোষণ ছিলো নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকিয়ে রাখার এক ব্যর্থ কৌশল!

১৯৩৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জার্মানির মিউনিখে জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালির মধ্যে সুদেতানল্যান্ড সম্পর্কে এক সম্মেলনে উল্লেখিত চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসলিনির মধ্যস্ততায় ঘটেছিলো সেই চুক্তি। এটাকেই বলা হয় "মিউনিক চুক্তি"। সেই চুক্তিতে সুদেতানল্যান্ড জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। 

মূলতঃ সুদেতান অঞ্চল দখল করার জন্য হিটলার চেকশ্লোভাকিয়া সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ শুরু করলে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেইন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দলাদিয়ের, ইতালির মুসোলিনি এবং হিটলারের মধ্যে যে চুক্তি হয় তার ফলে হিটলারকে চেকশ্লোভাকিয়ার সুদেতান হস্তান্তর করা হয়। 

ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ভেবেছিলো সুদেতান দিয়ে দিলে হয়তো হিটলারের সাম্রাজ্য ক্ষুধা প্রশমিত হবে। কারণ ইতোপূর্বে সে অস্ট্রেলিয়া দখল করেছিলো। সুদেতানের জন্য যুদ্ধ হলে হয়তো ইউরোপ বিশ্বযুদ্ধের আওতায় পড়ে যাবে!
অথচ মাত্র ৭ মাস পরই হিটলার চেকশ্লোভাকিয়া আক্রমণের মধ্য দিয়েই শুরু করে দিয়েছিলো মানব সভ্যতানাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ! 

সুদেতান অঞ্চলের মানুষরা জার্মানভাষি, সে হিসেবে তারা জার্মানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিশ্চয়ই স্বস্তি পেয়েছিলো বলেই আমার বিশ্বাস। সেদিক থেকে হিটলার একটি ভালো কাজ করেছিলেন বলতেই হয়।

অথচ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সুদূর রাওয়ালপিন্ডি থেকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে (পূর্ব পাকিস্তান)! 
বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার অভিপ্রায়ে গুলি ছোঁড়া হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় "রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই" দাবিতে ছাত্রদের ঐতিহাসিক মিছিলে! শহিদ হয়েছিলেন বরকত, জব্বার, রফিক, সালাম প্রমুখরা। সেই প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে হলেও উনসত্তরে হলো গণ আন্দোলন। সত্তরে হলো জাতীয় নির্বাচন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পুর্ব পাকিস্তান পেলো সংখ্যা গরিষ্ঠতা। 

 কিন্তু একাত্তরের মার্চ মাসের ২৫ তারিখে পাকিস্তানি শাসকদের ফ্যাসিবাদি আক্রমণের তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় পুর্ব পাকিস্তান হয়ে গেলো স্বাধীন "বাংলাদেশ"। পৃথিবীর সকল স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন বিস্ময়কর ইতিহাস বোধ করি আর নেই!

২৫ শে মার্চ কাল রাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী,  উর্দুভাষি দালাল, মুসলিম লিগ, বিহারি অফিসার, সরকারি কর্মচারি এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়লো বাঙালির উপর! বিশ্ববরেণ্য সিংহ হৃদয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হলো বন্দি। 

২৬ মার্চ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন।

 বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হলো পাকিস্তানের কারাগারে! 

৯ মাস চললো মুক্তিযুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করলো মিত্রবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। 

বায়ান্নের সেই ভাষা আন্দোলন থেকেই শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন। তখন আমার বয়োস ছিলো মাত্র ৪ বছর। কিন্তু তারপর যখন আমি  ক্লাশ ফাইভ সিক্সে লেখাপড়া করছিলাম তখন থেকেই ক্রমশ মন ও মানসে শুরু করেছিলাম এই সংগ্রাম। 

২রা মার্চ থেকে কুলাউড়ায় মুক্তিসংগ্রাম শুরু করেছিলাম আমি।  বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণ আমাকে করেছিলো স্বাধীনতায় উদ্দীপিত। মেজর জিয়াউর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার সাথে সাথেই আমরা শুরু করেছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও অস্ত্র সরবরাহ।  কুলাউড়ার আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আব্দুল জব্বার এবং আমার বাবা মরহুম মোবারক আলীর নেতৃত্বে আমাদের দ্বিতল "আজম হোটেল" এর একটি কক্ষে সেইসব রসদ,অস্ত্র, খাদ্যদ্রব্য জমা হতো, যার স্টক রিপোর্ট মেন্টেইন করতাম আমি।
আমার লেখা "মার্চ থেকে ডিসেম্বর" স্মৃতিকথায় গ্রন্থিত আছে সেসব ইতিহাস। ঐ লেখাটি ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিলো লন্ডন থেকে প্রকাশিত একমাত্র ব্রডশিট সাপ্তাহিক বাংলা সংবাদপত্র "পত্রিকা" তে। পরবর্তীতে সেই লেখাটির সাথে আমার আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত লেখা সমন্বয়ে ২০০৭ সালের একুশের বইমেলায় ঢাকা বাংলাবাজার থেকে আমির প্রকাশনী "মার্চ থেকে ডিসেম্বর" নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলো। 

২০১৩ সালের বইমেলায় পুনরায় ঢাকা বাংলাবাজার থেকে "ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ" বের করেছিলো "মার্চ থেকে ডিসেম্বর"  এর দ্বিতীয় সংস্করণ।

 ৭১ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে কুলাউড়ায় পাকবাহিনীর প্রধান মেজর মোগল আমাকে গ্রেফতার করে।  ২ দিন আমাকে পাকবাহিনীর ব্যারাকে রেখে ভয়ংকর টর্চার করা হয়েছিলো। ৩ ডিসেম্বর কুলাউড়ায় মিত্রবাহিনীর একটি রকেট এসে পড়ে কুলাউড়ায়। ঐদিন রাতেই পাকবাহিনী তাদের কামান গোলা রসদ নিয়ে কুলাউড়া ছেড়ে পালালে ৪ তারিখ কুলাউড়া মুক্ত হয় এবং আমিও হাজত থেকে মুক্ত হই। 

অবশেষে পূর্ণ বিজয় অর্জিত হলো ১৬ ই ডিসেম্বর। 

পরবর্তীতে ২১ ফেব্রুয়ারি হলো বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস।

লেখক: বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, নাট্য ব্যক্তিত্ব, লেখক ও সমাজকর্মি

লন্ডন , ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬