ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প।। ২৩।। ইয়ামাল : এক মানবিক ফুটবলার
।। ইয়ামাল : এক মানবিক ফুটবলার।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
উৎসর্গ
পৃথিবীর সব সংগ্রামী শিশু, অভিবাসী পরিবার এবং মানবতার পক্ষে নির্ভয়ে দাঁড়ানো মানুষদের প্রতি।

মাদ্রিদের রাজপথ আজ মানুষের ঢলে ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে উল্লাস, গান, পতাকা আর বিজয়ের স্লোগান। বিশ্বজয়ের আনন্দে স্পেন যেন উৎসবের দেশে পরিণত হয়েছে।
সেই বিজয় মিছিলের সামনে হাঁটছে এক তরুণ ফুটবলার। তার হাতে ট্রফি নেই, আছে একটি পতাকা।
ফিলিস্তিনের পতাকা।
হাজারো ক্যামেরা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ বিস্মিত হয়, কেউ প্রশংসা করে, কেউ সমালোচনা করে। কিন্তু ছেলেটি থেমে থাকে না। তার চোখে যেন একটি কথাই লেখা থাকে—খ্যাতি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখে।
এই ছেলেটির নাম লামিন ইয়ামাল।
কিন্তু এই গল্পের শুরু মাদ্রিদের রাজপথে নয়। শুরু বহু বছর আগে, মরক্কোর এক দরিদ্র জনপদে।
সেখানে এক দাদি, ফাতেমা, প্রতিদিন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। একদিন রাতে তিনি ছোট্ট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বলেন,
—“মুনির, আমি তোমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে তোমার ভবিষ্যৎটা একটু ভালো হতে পারে।”
ছোট্ট মুনির মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে কিছু বোঝে না, শুধু মায়ের চোখে জল দেখে।
ফাতেমা বুকভরা সাহস নিয়ে স্পেনের পথে বেরিয়ে পড়েন। সঙ্গে নেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, নেই নিশ্চিন্ত আশ্রয়। আছে শুধু সন্তানের জন্য একটি স্বপ্ন।
স্পেনে পৌঁছে তিনি দিন-রাত কাজ করেন। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রাতে বিছানায় শুয়েও ছেলের কথা ভাবেন। একসময় তিনি মুনিরকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
বছর গড়িয়ে যায়। বড় হয়ে মুনির বিয়ে করেন ইকুয়েটোরিয়াল গিনির অভিবাসী তরুণী শেইলা এবানাকে। কিন্তু নতুন সংসারে সুখের চেয়ে অভাবই বেশি থাকে।
একদিন শেইলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
—“মুনির, ঘরে খাবার কমে এসেছে।”
মুনির চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে বলেন,
—“আমি কাল আরও কাজ খুঁজব। কোনো না কোনোভাবে সংসারটা চালাব।”
ঠিক সেই কঠিন সময়ে দুই দয়ালু মানুষ তাদের পাশে দাঁড়ান। একজনের নাম লামিন, অন্যজনের নাম ইয়ামাল। তারা শুধু অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন না, ভেঙে পড়া পরিবারটিকে নতুন করে বাঁচার সাহসও দেন।
২০০৭ সালের ১৩ জুলাই একটি শিশুর জন্ম হয়।
শেইলা ক্লান্ত মুখে নবজাতককে কোলে নিয়ে বলেন,
—“এই শিশুর নাম কী রাখব?”
মুনির একটু ভেবে বলেন,
—“যারা আমাদের কঠিন সময়ে সাহায্য করেছে, তাদের নামেই রাখি। লামিন… ইয়ামাল।”
শেইলা মৃদু হেসে বলেন,
—“তাহলে সে যেন বড় হয়ে মানুষের উপকার করতে শেখে।”
এভাবেই জন্ম নেয় লামিন ইয়ামাল।
ছোট্ট লামিন একটু একটু করে বড় হতে থাকে। ফুটবল তার খেলনা হয়ে ওঠে। বল পায়ে নিলেই যেন অন্য এক জাদু জন্ম নেয়।
একদিন সে মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,
—“মা, একদিন আমি কি সত্যিই বড় ফুটবলার হতে পারব?”
মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন,
—“মানুষ হয়ে উঠতে পারলে, বড় ফুটবলার তো একদিন হবেই।”
এই কথাটি লামিনের মনে গেঁথে থাকে।
বছর ঘুরতে থাকে। ছোট্ট ছেলেটি বার্সেলোনার একাডেমি থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের বিস্ময়ে পরিণত হয়। তার পায়ের জাদু কোটি মানুষকে মুগ্ধ করে।
বার্সেলোনার একাডেমিতে এক সময় তার সঙ্গে দেখা হয় লিওনেল মেসির। মেসি তখন তরুণ এই প্রতিভাকে খুব কাছ থেকে দেখতেন। একদিন অনুশীলনের পর ক্লান্ত ও ঘামে ভেজা ছোট্ট ইয়ামালকে দেখে মেসি নিজেই তাকে যত্ন করে পরিষ্কার করে দেন, এমনকি তাকে গোসল করিয়ে দেন—একজন অভিভাবকের মতো। সেই মুহূর্তটি ইয়ামালের মনে গভীর ছাপ ফেলে জ্ঞান হবার পর, যেখানে সে শেখে ফুটবলের চেয়েও বড় কিছু হলো মানবতা ও যত্ন।

একদিন বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে সে দেখে, চারদিকে শুধু আলো আর ক্যামেরা। পাশে দাঁড়িয়ে এক সহখেলোয়াড় বলে,
—“লামিন, তুমি এখন বিশ্বতারকা।”
ইয়ামাল শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
—“তারকা হওয়া সহজ নয়, কিন্তু মানুষ থাকা আরও কঠিন।”
বিজয়ের আনন্দে যখন সবাই উল্লাসে মেতে ওঠে, তখন ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তুলে নেয়। একজন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করে,
—“তুমি কেন এই পতাকা হাতে নিয়েছ?”
ইয়ামাল কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর বলে,
—“যাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে চায় না, তাদের কথা মনে করিয়ে দিতে।”
তার এই অবস্থান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কেউ অভিযোগ তোলে, কেউ সমালোচনা করে। আবার অনেকেই তার সাহসের প্রশংসা করেন।
একজন প্রবীণ সমর্থক তাকে বলেন,
—“তুমি জানো, তোমার এই কাজ নিয়ে অনেক কথা হবে?”
ইয়ামাল হাসে।
—“হতে দিন। আমি শুধু মনে করি, অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকাও এক ধরনের উত্তর।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সত্য। দারিদ্র্য মানুষকে ছোট করে না। অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়াও কোনো সীমাবদ্ধতা নয়। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বপ্ন, পরিশ্রম, কৃতজ্ঞতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।

আজ কোটি কোটি শিশু লামিন ইয়ামালের ড্রিবলিং দেখে মুগ্ধ হয়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে মাঠের বাইরের গল্পে।
একজন দাদির সাহস, একজন বাবার সংগ্রাম, কয়েকজন অচেনা মানুষের দয়া, মেসির মতো একজন কিংবদন্তির স্নেহ এবং একটি শিশুর অদম্য স্বপ্ন—সব মিলিয়েই তৈরি হয় এক বিশ্বতারকা।
তাই লামিন ইয়ামালের জীবন শুধু ফুটবলের গল্প নয়।
এটি বিশ্বাসের গল্প।
এটি কৃতজ্ঞতার গল্প।
এটি সেই সত্যের গল্প, যা শেখায়—মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানলে তবেই প্রকৃত বিজয়ী হওয়া যায়।
লন্ডন, ২৭ জুলাই, ২০২৬