ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
টাওয়ার হ্যামলেটসে নয়টি আবাসিক ভবনে ৭ মাস ধরে চরম পানিসংকট
কমিউনিটি ডেস্ক, ১২ আগস্ট: পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের নয়টি আবাসিক ভবনে সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত পানির সরবরাহ নেই। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কল শুকিয়ে থাকছে, আবার কখনো পানির চাপ এতটাই কম থাকছে যে টয়লেট ফ্লাশ করা, রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজও করা যাচ্ছে না। ফলে শত শত পরিবারকে বোতলজাত পানির ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হচ্ছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত বছরের গ্রীষ্মে সমস্যার শুরু হলেও ডিসেম্বরের মধ্যে তা ব্যাপক আকার নেয়। এরপর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ব্যবস্থাপনায় থাকা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন Poplar Harca বলছে, পানির চাপ কমে যাচ্ছে এবং কখনো কখনো তা কিছু পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট থাকছে না। তবে পানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা তারা অস্বীকার করেছে।
‘পানি ছাড়া কীভাবে চলব?’
পানি না থাকায় অনেক পরিবারকে আগে থেকেই বোতল, জার ও বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতে হচ্ছে। পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সময় কখন আসবে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে জানা যায় না।
হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের কাছে পানি চাইলে পরিবারপ্রতি ১৫ লিটার পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হয়েছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। বড় পরিবারের জন্য এই পরিমাণ পানি দিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।
কেউ কেউ জানিয়েছেন, সংকট শুরুর বহু মাস পর তারা প্রথমবারের মতো পানি সরবরাহ পেয়েছেন।
বিকল্প হিসেবে বাসিন্দাদের পাবলিক গোসলের সুবিধা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ছোট শিশু, বয়স্ক কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়ে বসবাস করা পরিবারের কাছে অন্য জায়গায় গিয়ে গোসল করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
নতুন ভবন, পুরোনো পানির লাইন
এই সংকটের সঙ্গে টাওয়ার হ্যামলেটসে দ্রুত বাড়তে থাকা নতুন আবাসন প্রকল্পের সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কিছু বাসিন্দার দাবি, আশপাশে নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সময় থেকেই পানির সমস্যা প্রকট হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন ভবনের বাড়তি চাহিদার চাপ পড়েছে পুরোনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
Thames Water-এর তদন্তেও এলাকায় ব্যাপক নতুন উন্নয়নকে পানির চাপ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে বাড়তে থাকা চাহিদা সামাল দিতে পুরো এলাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে পরিকল্পনার বিষয়টি তারা পরীক্ষা করছে।
তবে সমস্যার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর অভ্যন্তরীণ প্লাম্বিংয়ের সঙ্গেও জড়িত হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি।
পাম্প বসাতে এত দেরি কেন?
Poplar Harca জানিয়েছে, আক্রান্ত ভবনগুলোতে নতুন পাম্প ব্যবস্থা স্থাপন করলেই স্থায়ীভাবে পানির চাপের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সেই কাজ শুরু করতেও দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলছে। ভবনগুলোর কিছু ফ্ল্যাট Right to Buy-এর মাধ্যমে বাসিন্দাদের মালিকানায় চলে যাওয়ায় বড় ধরনের সংস্কারের খরচ কে কতটা বহন করবে, তা নির্ধারণে Section 20 প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের যুক্তি, পানি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে সেই আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাজ শুরু করার প্রয়োজন তারা মনে করেনি।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী পানি সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত শুরু করে পরে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘এটি মৌলিক অধিকার’
এলাকার এমপি উমা কুমারান ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
তার বক্তব্য, পানি কোনো বাড়তি সুবিধা নয়—এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে বাসিন্দাদের পর্যাপ্ত পানি না পাওয়াকে তিনি অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে লন্ডনে যখন আবারও তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন পানি সরবরাহের এই সংকটকে আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন তিনি।
কমিউনিটি সংগঠন Acorn-এর পক্ষ থেকেও পরিস্থিতিকে গুরুতর বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিযোগ একত্র করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
সমাধানের অপেক্ষায় বাসিন্দারা
Poplar Harca বলছে, ছয়টি ভবনে ৫ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও তিনটি ভবনে কাজ শুরু হওয়ার কথা ২৭ আগস্ট।
অর্থাৎ, কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের প্রায় এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
লন্ডনের মতো উন্নত নগরীতে একটি আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের মাসের পর মাস পানির জন্য বোতল মজুত করে রাখতে হচ্ছে—এই ঘটনাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্নটি শুধু পানি কখন আসবে, তা নয়।
প্রশ্ন হলো—নতুন শহর গড়ে তোলার দৌড়ে পুরোনো অবকাঠামোর ওপর যখন বাড়তি চাপ পড়ছে, তখন সেই শহরের মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজনটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আসলে কার?