ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪০।। যে দেশে শিক্ষক অসহায়, সে জাতি করবে হায় হায়

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪০।।  যে দেশে শিক্ষক অসহায়, সে জাতি করবে হায় হায়

উৎসর্গ:

চক, ডাস্টার আর বই হাতে নীরবে জাতি গড়তে থাকা সকল শিক্ষকের প্রতি-

যাঁরা মেরুদন্ড সোজা করে শিক্ষকতা করছেন এখনও

কটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ হয় শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন শিক্ষক। অথচ যে শিক্ষক আগামী প্রজন্মকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা দেন, আজ তিনিই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। যে সমাজে শিক্ষকের সম্মান ক্ষয়ে যায়, সেখানে শুধু একজন মানুষ অপমানিত হন না; অপমানিত হয় শিক্ষা, দুর্বল হয় মূল্যবোধ, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে জাতির ভবিষ্যৎ। তাই যে দেশে শিক্ষক অসহায়, সে জাতির একদিন হায় হায় করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।

একসময় বলা হতো, শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। আজ সেই কারিগরই যেন সবচেয়ে অসহায়। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে গিয়ে তিনি ভাবেন—আজ কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবক ক্ষুব্ধ হবে না তো? একটি শাসন, একটি কঠোর কথা কিংবা একটি ভুল বোঝাবুঝি তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না তো?

বাংলাদেশে শিক্ষক লাঞ্ছনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি উদ্বেগজনক সামাজিক বাস্তবতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিক্ষক অপমানিত, লাঞ্ছিত বা হামলার শিকার হচ্ছেন। কোথাও অভিভাবক বিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষিকাকে মারধর করছেন, কোথাও শিক্ষার্থী নিজেই শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে। আবার কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তি একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপদস্থ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়ে যায় চরিত্রহনন, তারপর নেমে আসে জনতার বিচার।

এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষক এখন শুধু পাঠদান করেন না; প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে হিসাব করেন, কোনো কথা বিতর্ক তৈরি করবে কি না। অনেকেই শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে ভয় পান। ফলে শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, আর শিক্ষকতার পেশা হারাচ্ছে তার মর্যাদা।

একটি সমাজে যখন শিক্ষক নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, তখন বুঝতে হবে সংকট শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই; সংকট ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের মূল্যবোধে। কারণ যে জাতি তার শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে না, সেই জাতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সম্মানবোধ শেখাতে পারে না।

অথচ পৃথিবীর ইতিহাস অন্য এক গল্প বলে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে দেখে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ভেঙে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তাঁর শিক্ষকের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন কৃতজ্ঞতা জানাতে। নোবেলজয়ী আবদুস সালাম তাঁর শিক্ষককে নোবেল পদক পরিয়ে বলেছিলেন, “এটি আপনারই প্রাপ্য।” আমাদের দেশেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁদের শিক্ষকদের প্রতি অসাধারণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সত্যিকারের বড় মানুষরা কখনো তাঁদের শিক্ষকের ঋণ অস্বীকার করেন না।

প্রশ্ন হলো, আমরা কোন পথে হাঁটছি? যে সমাজে শিক্ষককে শ্রদ্ধা করার বদলে অপমান করা হয়, সেখানে জ্ঞানের আলো নয়, অন্ধকারই বিস্তার লাভ করে। অবশ্যই কোনো শিক্ষক অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বিচার কখনো মব, মারধর বা অপমানের মাধ্যমে হতে পারে না। আইনের শাসনের বিকল্প জনতার উন্মত্ততা হতে পারে না।

শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। কারণ একজন শিক্ষককে রক্ষা করা মানে কেবল একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়; একটি জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। অন্যথায় ইতিহাস একদিন নির্মম ভাষায় বলবে—যে দেশে শিক্ষক অসহায়, সে জাতি শেষ পর্যন্ত শুধু হায় হায়ই করেছে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১৯ জুলাই ২০২৬